ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রচারণামূলক বড় বড় পোস্টার এখনো দেশটির গণপরিবহনের বাসগুলোতে দেখা যাচ্ছে। এসব পোস্টারে নেতানিয়াহু, যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে ইসরাইলের, সম্পর্ক পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জে আইজেনকট

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: স্টাফ রির্পোটার।

আপলোড সময় : ৬ নভেম্বর ২০২৬, বিকাল ৭:৬ সময় , আপডেট সময় : ৬ নভেম্বর ২০২৬, বিকাল ৭:৬ সময়
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রচারণামূলক বড় বড় পোস্টার এখনো দেশটির গণপরিবহনের বাসগুলোতে দেখা যাচ্ছে। এসব পোস্টারে নেতানিয়াহু, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আকাশে উড়ন্ত যুদ্ধবিমানের ছবি স্থান পেয়েছে। ইরানে দুই দেশের যৌথ সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে নেতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব পোস্টার আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের বাস্তব চিত্র প্রকাশ করছে না।নেতানিয়াহুর অনিশ্চিত নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা বড় ব্যবধানে ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস নির্বাচিত করেছেন তারা। নতুন এই কংগ্রেস ইরান, গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মতো ইস্যুতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে আগ্রহী। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সৌদি সংবাদমাধ্যম আশরক আল-আওসাতের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, দুই দেশের পরপর অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে অনেক পর্যবেক্ষক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তাদের ধারণা, বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ইসরাইলের জন্য আগের মতো অবধারিত থাকবে না। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইয়েল স্টার্নহেল বলেন, ‘এটি একটি নতুন সময়ের সূচনা। গাজা ও ইরানের যুদ্ধের সম্মিলিত প্রভাব মার্কিন সমাজের মূলধারার মানুষের মধ্যে ইসরাইল সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনেছে। শুধু ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যেই নয়, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।’ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভোটারদের সমর্থন পুনরুদ্ধারের চারটি কৌশলের কথা তুলে ধরেন। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ইরান যুদ্ধের অবসান এবং ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ধরন পরিবর্তনের বিষয়টিও ছিল। 

এ বিষয়ে ট্রাম্পও ভিন্নমত প্রকাশ করেননি। মঙ্গলবার ভোট গ্রহণ চলার সময় তিনি জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরাইলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিনি একমত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের যোগসূত্রও স্পষ্ট করেন তিনি। ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রায় দুই দশক ধরে কয়েক দফায় ক্ষমতায় রয়েছেন। ট্রাম্পের সমর্থন আদায়ে তিনি ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছেন। একই সময়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হলে তা মোকাবিলায় ইসরাইলের ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকে ঝুঁকে পড়া প্রয়োজন হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল কিংবা ট্রাম্পের সামরিক সহায়তা বন্ধের বক্তব্য নিয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেননি নেতানিয়াহু। তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক আমিত সেগাল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ইসরাইলের জন্য ‘বিপর্যয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। আইজেনকট কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করতে পারবেন? 

নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন নেতা গাদি আইজেনকট। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজেকে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছেন তিনি। এক বিবৃতিতে ইসরাইলের সাবেক এই সামরিক প্রধান জানান, তিনি উদারনৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও গঠনমূলকভাবে কাজ করতে আগ্রহী। আইজেনকটের জোটে থাকা বামপন্থীদের অন্যতম নেতা ইয়ার গোলানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিদলীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তার অভিযোগ, নেতানিয়াহু এই সম্পর্ক নষ্ট করেছেন। তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘স্থায়ী যুদ্ধ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের ধ্বংসাত্মক ইসরাইলি বয়ান’ ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও তোলেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় নেতানিয়াহু ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের বিরোধিতা করার বিষয়টি গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন। তাদের মধ্যে বারাক ওবামাও রয়েছেন, যিনি এখনো অনেক ডেমোক্র্যাটের কাছে জনপ্রিয়। প্রায় এক দশক আগে ইরান বিষয়ে ওবামার কূটনৈতিক উদ্যোগের বিরোধিতা করতে নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই রিপাবলিকানদের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছিলেন।

ইয়েল স্টার্নহেলের ভাষ্য, নেতানিয়াহু ডেমোক্র্যাটদের ক্ষুব্ধ করেছেন এবং তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য সম্ভব সবকিছুই করেছেন। তিনি আরও বলেন, আইজেনকট তুলনামূলক ভালো ব্যক্তি হলেই নতুন কংগ্রেসের কাছ থেকে ইতিবাচক আচরণ পাবেন, বিষয়টি এমন নয়। এ ক্ষেত্রে তাকে নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। স্টার্নহেলের মতে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রায় বাধাহীনভাবে হামলা চালানো উগ্রপন্থী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলে আইজেনকট দেশটির সাধারণ মানুষের সমর্থন অর্জন করতে পারেন। তবে ইসরাইলি সমাজ এরই মধ্যে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকেছে। গাজা যুদ্ধের শুরুর দিকেও দেশটির জনগণের মধ্যে এ যুদ্ধের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন ছিল।

ইসরাইলের বিরুদ্ধে সমালোচনা আরও জোরালো হচ্ছে
নতুন মার্কিন কংগ্রেসে আব্দুল এল-সায়েদের মতো প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের উপস্থিতি থাকবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞকে তিনি গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে ইসরাইল বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে কাজ করা ইসরাইলি গবেষণা সংস্থা ইকোনমিক কো-অপারেশন ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক পরিচালক এলি কোয়াজ বলেন, নেতানিয়াহু শুধু রিপাবলিকানদের ওপর নয়, ব্যক্তিগতভাবেও ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করেছে, সেই নির্ভরতারও একটি সীমা ছিল। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হচ্ছে, সমস্যাটি কেবল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সামগ্রিক সম্পর্কেই জটিলতা তৈরি হয়েছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক গবেষক এহুদ এলিয়ামের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়াও চলার মতো বড় অস্ত্রশিল্প ইসরাইলের রয়েছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো রাষ্ট্রের বাইরের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশটি এখনো সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা কমে গেলে ইসরাইলকে তুলনামূলক কম দামি কামানের গোলা কিংবা নিম্নমানের বোমার ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়বে। আর বেসামরিক মানুষের এই ক্ষয়ক্ষতিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলবিরোধী ক্ষোভ বাড়িয়েছে।

এহুদ এলিয়াম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার বড় অংশ কিংবা পুরো সহযোগিতা হারানোর মতো নতুন কৌশলগত পরিস্থিতির সঙ্গে ইসরাইল মানিয়ে নিতে পারবে। তবে কাজটি সহজ হবে না। এ পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া বা কর বাড়ানোর মতো কঠিন পদক্ষেপও বিবেচনা করতে হতে পারে। এলি কোয়াজের মতে, ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন আইজেনকট এখন বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, তিনি অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধ পরিস্থিতি ধরে রাখার পরিবর্তে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত চুক্তিকে গুরুত্ব দিতে চান। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আইজেনকট নেতানিয়াহুর তুলনায় স্পষ্টতই ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরছেন।

সূত্র: আশরক আল-আওসাত

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯