কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মানবপাচারকারী চক্রের গোপন আস্তানা ও বন্দিশালা উচ্ছেদে ফের বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে যৌথ বাহিনী। শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা-রঙ্গীখালী এলাকার দুর্গম পাহাড়ে এ অভিযান শুরু হয়। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের দেড় শতাধিক সদস্য অংশ নিয়েছেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) একই এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে মানবপাচারকারীদের একটি গোপন বন্দিশালা থেকে ৫৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় চক্রটির পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। অভিযান চলাকালে সশস্ত্র পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। এ সংঘর্ষে সেনাবাহিনীর সৈনিক মোহাম্মদ তিতাস শেখ (২৭) গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। শুক্রবার সন্ধ্যায় সামরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফরিদপুরের নগরকান্দায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে দাফন সম্পন্ন হয়। এদিকে উদ্ধার হওয়া ৫৭ জনকে শুক্রবার টেকনাফ মডেল থানার প্রাঙ্গণে তাঁদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন রোহিঙ্গা এবং ৫১ জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। এ ঘটনার পর রঙ্গীখালীর পাহাড়ে আরও তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার তথ্য সামনে আসে। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম জানান, দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির সময় কয়েকজন নিহত হয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। বন্দিশালার কাছাকাছি তিনটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে মরদেহগুলো মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের, নাকি বন্দিদশা থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনো ভুক্তভোগীর, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন তিনি। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যে পাহাড়ের গোপন বন্দিশালায় মানবপাচারকারীদের প্রতারণা, নির্যাতন ও জিম্মি করে রাখার নানা তথ্য উঠে এসেছে। ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান জানান, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে কক্সবাজারে নিয়ে আসা হয়। পরে পাহাড়ের একটি গোপন আস্তানায় আটকে রাখা হয় তাঁকে। সেখানে টানা আট দিন বন্দি থাকার পরও দুইবার পালানোর চেষ্টা করে সফল হননি। আসাদুজ্জামান বলেন, ওই বন্দিশালায় ৫০ জনের বেশি মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁদের সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। পাহাড়ি আস্তানাটি সশস্ত্র ব্যক্তিরা পাহারা দিতেন। বন্দিদের মুঠোফোনসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়ায় বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ ছিল না।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, রঙ্গীখালীর পাহাড়ে তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার তথ্য পুলিশ পেয়েছে। তবে সেগুলো উদ্ধার না করা পর্যন্ত সেখানে মরদেহের অস্তিত্ব বা পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পুলিশ কাজ করছে বলেও জানান তিনি। পুলিশ সুপার আরও বলেন, মানবপাচারকারী চক্রের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর অভিযান চলবে। স্থানীয় সূত্র ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বর্ণনা অনুযায়ী, টেকনাফের দুর্গম পাহাড় দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচারকারীদের গোপন আস্তানা ও বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। চাকরি কিংবা বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে এসব স্থানে এনে জিম্মি করা হয়। পরে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় অথবা সাগরপথে পাচারের চেষ্টা চলে। বৃহস্পতিবারের অভিযানের পর পাহাড়ে আরও তিনটি মরদেহ থাকার তথ্য সামনে আসায় ওই এলাকায় যৌথ বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।