যুক্তরাষ্ট্রে প্রস্তাবিত নতুন কর আইন যদি পাস হয়, তবে এর ফলে বাংলাদেশের বৈধ রেমিটেন্স প্রবাহ বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হতে পারেন, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এ যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্যান্য দেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে কর আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। গত রোববার এই বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছে মার্কিন হাউজ বাজেট কমিটি। বিলটি আগামী সপ্তাহে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে তোলা হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, “ব্যাংকিং চ্যানেলে বাড়তি ৫ শতাংশ কর আরোপ হলে তো তখন অনেকেই পাঠাবেন না। বিকল্প হিসেবে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিটেন্স পাঠাবে। তাতে বাংলাদেশের রিজার্ভে সরাসরি প্রভাব পড়বে।”
বর্তমানে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিটেন্স এসেছে ৩৯৪ কোটি ডলার, যা সব দেশ মিলিয়ে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আগত ৩১২ কোটি ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত কর আইন পাস হলে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রায় ৩ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কর ছাড় না থাকায় যে কেউ যেকোনো অঙ্কের অর্থ পাঠালেই ৫ শতাংশ কর দিতে হবে— এমনকি গ্রিনকার্ডধারী বা এইচ-১বি এবং এফ-১ ভিসাধারীরাও এই করের আওতায় পড়বেন।
এই কর আরোপের কারণে প্রবাসীরা রেমিটেন্স পাঠাতে নিরুৎসাহিত হবেন এবং হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের উপর নির্ভরশীলতা বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “রেমিটেন্স কমলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ পড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে দুর্বল করে তুলতে পারে।”
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার মনে করেন, প্রস্তাবিত এই আইন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিদেশে গমন রোধ করতেই করা হচ্ছে। “বিভিন্ন দেশে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, যারা রেমিটেন্স পাঠায়, তাদের কাছ থেকে করের মাধ্যমে কিছু অর্থ ধরে রাখা সম্ভব,” বলেন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ৩৯৪ কোটি ডলারের ওপর প্রস্তাবিত ৫ শতাংশ কর বসলে অতিরিক্ত ১৯.৭ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হতো প্রবাসীদের। এ ধরনের বাড়তি ব্যয় বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর ইচ্ছাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
এখন পর্যন্ত বিলটি পাস হয়নি, ফলে রেমিটেন্স প্রবাহ ঠিক কতটা কমতে পারে সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান বলেন, “আমাদের বিভাগ এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। কতটা প্রভাব পড়বে তা সময়ই বলে দেবে।”
বিশেষজ্ঞদের আহ্বান, এ ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারকে এখনই কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা উচিত এবং বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।