ডিজিটাল যুগের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে হাতের লেখার চর্চা। মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নানা অ্যাপের কারণে এখন পড়াশোনা থেকে শুরু করে অফিস-আদালতের কাজ পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই হচ্ছে টাইপ বা ভয়েস কমান্ডে। ফলে কাগজ-কলমের ব্যবহার দিন দিন কমছে। একইসাথে কমছে হাতের লেখার দক্ষতাও।
প্রেমিক-প্রেমিকার হাতে লেখা চিঠি-পত্রের যে কদর ছিলো, তাও আজ বিলীন হয়ে যাওয়া পথে। শুধু প্রেমিক-প্রেমিকা ই নয়, যারা তরুণ শিক্ষার্থী রয়েছে তারাও আজ এই হাতের লেখা নিয়ে বেশ ভয়ে দিন যাপন করে। বছরজুড়ে অনুশীলন থাকার না কারণে পরীক্ষার সময় বেশ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
পরীক্ষায় টানা ৩-৪ ঘণ্টা লিখতে হবে, এ শুনলেই অনেকের মাঝে আতঙ্ক জেগে উঠে। কী লিখবে এতক্ষণ আর কীভাবে লিখবে। উচ্চ শিক্ষার জন্য বর্তমান সময় ইংরেজি ভাষা শিক্ষার একটি পরীক্ষা হলো আইইএলটিএস। এই পরীক্ষায় একজন পরীক্ষার্থী তিন পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করতে পারে। কেউ কাগজ-কলমে হাতে লিখে উত্তর করার জন্য আবেদন করে আবার কেউ কম্পিউটার বেইজড পরীক্ষার জন্য আবেদন করে। তবে বর্তমান সময়ে হাতের লিখার চেয়ে কম্পিউটার বেইজড পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েই চলছে।
কাগজ-কলমে লিখার জন্য বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের এই সমস্যাকে মনোবিজ্ঞানীরা গ্রাফোফোবিয়া (হাতের লেখার ভয়) হিসেবে উল্লেখ করছেন। তবে এটি শুধু মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাই নয়। এর পেছনে সাংস্কৃতিক কারণও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব ফেলছে।
ভারতের একটি জরিপে দেখা গেছে, ২০১২ সালে প্রায় ৩৬.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছিল তারা হাতের লেখা খারাপ বলে লিখতে অনীহা বোধ করে। বিষয়টি আরো গুরুতর হয়ে ওঠে শারীরিক ও মানসিক শাস্তির কারণে। চলতি বছর মুম্বাইয়ে এক টিউশন শিক্ষক খারাপ হাতের লেখার অজুহাতে মাত্র আট বছর বয়সী এক শিশুর হাত মোমবাতি দিয়ে পোড়ানোর ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
দেশটির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্কুলে বারবার শাস্তি হিসেবে লেখা; একই বাক্য শতবার লিখতে বাধ্য করা, শিক্ষার্থীর মনে লেখার সঙ্গে অপমান ও যন্ত্রণার সম্পর্ক তৈরি করে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত ডায়েরি, প্রেমপত্র বা গোপন লেখনী পরিবার বা শিক্ষকের হাতে ধরা পড়লে যে লজ্জা ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়, তাও অনেকে সারাজীবন মনে বহন করে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজিটাল যুগে লেখার চর্চা কমে যাওয়ায় ভীতি আরও বাড়ছে। পরীক্ষায় দীর্ঘ উত্তর লিখতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী আতঙ্কে ভোগে। কর্মক্ষেত্রে ফর্ম পূরণের মতো সাধারণ কাজও হয়ে দাঁড়ায় মানসিক চাপের কারণ।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ধাপে ধাপে লেখার চর্চা, ট্রমা-সচেতন থেরাপি এবং সহানুভূতিশীল শিক্ষাব্যবস্থা এ ভীতি কাটাতে কার্যকর হতে পারে। তারা বলছেন, হাতের লেখা খারাপ হলেও শিক্ষার্থীর যোগ্যতা কমে যায় না এই বার্তা পরিবার ও প্রতিষ্ঠান উভয়কেই গ্রহণ করতে হবে।