যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন ইঙ্গিত পাওয়ার পর বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই ক্রুড অয়েলের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমেছে।
বাজারের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪ দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ১০৮ দশমিক ৬৬ ডলারে নেমেছে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৬১ ডলারে লেনদেন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের অবসানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনায় বসতে আগ্রহী—এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই জ্বালানি বাজারে এই দরপতন দেখা যায়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধের শর্তসহ ইরানের অন্যান্য দাবি মেনে নিলে দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে তেহরান। এসব ইতিবাচক ইঙ্গিত তেলের ভবিষ্যৎ বাজারদরে নিম্নমুখী চাপ তৈরি করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান মহসেন রেজাইয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। সাম্প্রতিক কয়েক মাসের মধ্যে এটিকে দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আলোচনার সম্ভাবনায় জ্বালানি ব্যয়ের চাপ কমার আশায় আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারের বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে বড় জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দর এখনো নিম্নমুখী রয়েছে। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন গ্লোবাল রিস্ক ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিশ্লেষক আর্নে লোহম্যান রাসমুসেন। তাঁর মতে, মঙ্গলবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পের আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপও হতে পারে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকায় দীর্ঘ সময় জ্বালানির দাম চড়া থাকার ঝুঁকিও রয়েছে।
মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশা, নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারা কংগ্রেসের অন্তত একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে। এমনটি হলে গত দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ তৈরি হতে পারে। রিপাবলিকানদের একক আধিপত্য দুর্বল হলে ট্রাম্পকে দেশে মূল্যস্ফীতি, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত এবং ওয়াশিংটনে তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের মুখোমুখি হতে হতে পারে। বিশ্ববাজারের অন্যান্য খাতেও মিশ্র পরিস্থিতি দেখা গেছে। জাপানের চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কিওক্সিয়ার শেয়ারের দাম সোমবার প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় এই দরপতন ঘটে। বছরের শুরু থেকে শেয়ারের দাম ২০০ শতাংশের বেশি বাড়লেও জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ নিচে রয়েছে।
অন্যদিকে এশিয়ার প্রযুক্তি খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। তাইওয়ানের টিএসএমসির শেয়ারের দাম প্রায় ২ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দর ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ চুরির ঘটনায় শুক্রবার বাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছিল। সেই ধাক্কা কাটিয়ে বিটকয়েনসহ অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রার দাম ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হচ্ছে। এদিকে ইউরোপের করপোরেট খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ফরাসি ট্রেন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আলস্টম। তাদের নতুন ‘কোরাডিয়া ম্যাক্স’ আঞ্চলিক ট্রেন উৎপাদনে ত্রুটি থাকার বিষয়টি স্বীকার করার পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ২৫ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
গত ছয় মাসে দ্বিতীয়বারের মতো মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা কমাতে বাধ্য হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর ফলে বছরের শুরুতে প্রায় ১২ বিলিয়ন ইউরো থাকা আলস্টমের বাজারমূল্য কমে বর্তমানে ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে।
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন