ঢাকা | |

তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান চলছে ৫০ থেকে ৮০ লাখ

দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান চলাচল করছে। এসব যান চার্জ দিতে প্রতিদিন
  • আপলোড সময় : ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:১ সময়
  • আপডেট সময় : ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:১ সময়
তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান চলছে ৫০ থেকে ৮০ লাখ

দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান চলাচল করছে। এসব যান চার্জ দিতে প্রতিদিন দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি। বিপরীতে শুধু রাজধানীতেই ৪৮ হাজারের বেশি অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


সোমবার সংসদে কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধিতে সংরক্ষিত মহিলা আসনের বিএনপি দলীয় সদস্য রেহানা আক্তার রানুর আনা জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের জবাবে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মন্ত্রী বলেন, অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে জাতীয় গ্রিড ও স্থানীয় বিতরণব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।


গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান নগর ও গ্রামীণ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কম ভাড়া, সহজলভ্যতা এবং স্বল্প দূরত্বে দ্রুত যাতায়াতের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে এসব যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে দ্রুত ও অনেকাংশে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে অটোরিকশা এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপুলসংখ্যক যান একসঙ্গে চার্জ দেওয়ায় স্থানীয় বিতরণব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। পাশাপাশি আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগের বাণিজ্যিক ব্যবহার, ট্রান্সফরমার ও বিতরণ লাইনে বাড়তি চাপ এবং সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির মতো সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।


সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা বসানোর পর লালবাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘনের মতো অনিয়ম কমেছে। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল এখনো নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এসব যানবাহনে নম্বর প্লেট না থাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরায় শনাক্ত হলেও জরিমানা করা সম্ভব হচ্ছে না।


তিনি অটোরিকশায় নম্বর প্লেট সংযোজন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের আওতায় আনা এবং প্রধান সড়ক থেকে এসব যান সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন। রেহানা আক্তার রানুর দাবি, বর্তমানে রাজধানীতে প্রতিদিন আরও প্রায় ৩০০টি অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে। তার হিসাবে, প্রতিদিন অটোরিকশার চার্জিংয়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে, যা লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ। বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধ সংযোগ নিয়ে চার্জ দেওয়ার ফলে বিপুল অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে অটোরিকশার সঙ্গে বিপুল মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত উল্লেখ করে তিনি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে এসব যান জব্দ, ডাম্পিং কিংবা চালকদের হয়রানি না করার আহ্বান জানান।


সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে অটোরিকশা-


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল শুধু যানজটই বাড়াচ্ছে না, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি করছে। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় যুক্ত যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অংশ ছিল ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ।


অনিবন্ধিত যানবাহন, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, ব্রেক ও আলোর ব্যবস্থায় ত্রুটি, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। এ ছাড়া নির্দিষ্ট রুট, স্ট্যান্ড, পার্কিং ও যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় রাজধানীতে এসব যান যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।


ব্যাটারির বর্জ্যে বাড়ছে দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি-


অটোরিকশায় ব্যবহৃত সিসাযুক্ত ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের কারণে সিসাদূষণ, মাটি ও পানিদূষণ বাড়ছে। এতে বিশেষ করে শিশু শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি ও পোল্ট্রি শিল্পও ক্ষতির মুখে পড়ছে।


রাজধানীতে আরও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা-


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা চালু রয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে আরও ২০০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতেও এসব ক্যামেরা বসানো হবে।


অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আসছে নতুন নীতিমালা-


অটোরিকশাকে সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নীতিমালা কার্যকর হলে অনুমোদিত অটোরিকশাকে নম্বর প্লেট ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে। চালকদের নিবন্ধনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যায়ক্রমে লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে। নির্ধারণ করা হবে অটোরিকশার চলাচলের সড়ক। একই সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যা, রুট, চালক ও চলাচল ব্যবস্থাপনাও নিয়ন্ত্রণ করা হবে।


একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে যাতে একাধিক অটোরিকশা চালানো না যায়, সেই ব্যবস্থাও করা হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যাটারি ও যানবাহন শনাক্ত ও অনুসরণ করার ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী।


সরকারের লক্ষ্য কর্মসংস্থান ঠিক রেখে নিয়ন্ত্রণ-


রেহানা আক্তার রানু বলেন, তিনি অটোরিকশা নিষিদ্ধ করার কথা বলেননি, বরং এসব যান নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। অটোরিকশার সঙ্গে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত হওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থা না করে বাহন জব্দ, ডাম্পিং বা পুলিশি হয়রানি করা ঠিক হবে না। প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে এসব যান চলাচলের সুযোগ দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।


জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং নীতিমালা ও বিধি প্রণয়নের কাজ এগিয়েছে। কর্মসংস্থান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, পরিবেশ রক্ষা হয় এবং যানবাহনের শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বেকারত্ব না বাড়িয়ে ও কর্মসংস্থান ব্যাহত না করে অটোরিকশার চলাচল সুশৃঙ্খল করা, পরিবেশ রক্ষা এবং দেশের সড়ক ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো।

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
এলএনজি টার্মিনাল-২ চুক্তি পুনর্বহালের দাবি সামিটের

এলএনজি টার্মিনাল-২ চুক্তি পুনর্বহালের দাবি সামিটের