একজন সংসদ সদস্য দল থেকে বহিষ্কৃত, গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে—তবুও তাঁর সংসদ সদস্য পদ আপাতত বহাল। এখানেই সামনে এসেছে বড় একটি প্রশ্ন—সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও নৈতিক আচরণের জন্য দেশে কি আদৌ কার্যকর কোনো বাধ্যতামূলক আচরণবিধি আছে? গাজী নজরুল ইসলামের সাম্প্রতিক ঘটনায় সেই প্রশ্নই নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে গত ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী দল থেকে বহিষ্কার করে। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ ওঠে এবং দলীয় তদন্তের পর তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। পরে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং রিমান্ডে নেওয়া হয়। এসব ঘটনার পরও তাঁর সংসদ সদস্য পদ কেন বহাল রয়েছে—এই প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।
তবে আইনি দিক থেকে বিষয়টি সরল নয়। টিআইবিও জানিয়েছে, শুধু অভিযোগ, গ্রেপ্তার, রিমান্ড বা দলীয় তদন্তের সিদ্ধান্তের কারণে একজন সংসদ সদস্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাংবিধানিকভাবে অযোগ্য হয়ে যান না। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড হলে সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্যতা তৈরি হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে। কোনো সংসদ সদস্য নিজে দল থেকে পদত্যাগ করলে কিংবা সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল যদি একজন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করে, তাহলে শুধু সেই বহিষ্কারের কারণে তাঁর আসন শূন্য হবে কি না—এ বিষয়ে ৭০ অনুচ্ছেদে সরাসরি কোনো বিধান নেই।
এই কারণেই গাজী নজরুলের ঘটনায় সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা দেখার পর তাঁর সংসদ সদস্য পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে দল থেকে বহিষ্কার হওয়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্য পদ হারানোর কারণ নয় বলেও তিনি জানিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, জামায়াত দলীয় প্যাডে গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের বিষয়টি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। তবে সংসদ সচিবালয় থেকে স্পিকারের মাধ্যমে বিষয়টি এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে ইসি সচিবালয়ের বক্তব্য এসেছে।
এরই মধ্যে গাজী নজরুলকে সংসদীয় কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া এবং সংসদ সদস্য পদ হারানো—দুটি বিষয় এক নয়। ফলে সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর সাংবিধানিক অবস্থান এখনো বহাল রয়েছে। এখানেই সামনে আসছে দীর্ঘদিনের আরেকটি প্রশ্ন—সংসদ সদস্যদের জন্য কি আলাদা নৈতিক আচরণবিধি প্রয়োজন?
তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী সংসদ সদস্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে একটি বেসরকারি বিল সংসদে তুলেছিলেন। সেখানে সংসদ সদস্যদের নৈতিক অবস্থান, স্বার্থের সংঘাত, আয়-রোজগারের তথ্য, উপহার গ্রহণ এবং সরকারি সম্পদের ব্যবহারের মতো বিষয় নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব ছিল। একটি নৈতিকতা কমিটি গঠনের প্রস্তাবও ছিল ওই উদ্যোগে। বিলটি সংসদীয় কমিটিতে গেলেও শেষ পর্যন্ত আইন হিসেবে পাস হয়নি।
বর্তমানে সংসদ অধিবেশন চলাকালে সদস্যদের আচরণ মূলত সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু সংসদের বাইরে কোনো সদস্যের ব্যক্তিগত আচরণ, স্বার্থের সংঘাত কিংবা গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন তৈরি হলে তার জন্য পূর্ণাঙ্গ ও বাধ্যতামূলক পৃথক আচরণবিধি এখনো নেই—এমন বিষয়ই নতুন করে সামনে এসেছে।
টিআইবি বলছে, জনপ্রতিনিধিদের জন্য বিশেষায়িত ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সংস্থাটির বক্তব্য অনুযায়ী, এমন বিধিতে নৈতিক স্খলন, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বার্থের সংঘাত এবং সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্নকারী আচরণের ক্ষেত্রে কী ধরনের জবাবদিহি হবে, তা স্পষ্ট থাকা দরকার।
অন্যদিকে, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর ফৌজদারি দায় শেষ পর্যন্ত আদালতের বিচার ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তবে তাঁর ঘটনাকে ঘিরে যে সাংবিধানিক ও নৈতিক প্রশ্ন সামনে এসেছে, তা আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে—সংসদ সদস্যদের আচরণ ও জবাবদিহির জন্য সুস্পষ্ট কাঠামো থাকা উচিত কি না, সেই বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন