একটি জন্মসনদ নিতে দিনের পর দিন ইউনিয়ন পরিষদে ঘুরতে হবে—এটা কি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য? জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার যদি মানুষের এই সাধারণ ভোগান্তিও দূর করতে না পারে, তাহলে সেই সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে কীভাবে? এবার এমন প্রশ্নই সামনে এনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তিনি বলেছেন, জনগণের সেবা করাই নির্বাচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব। জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে সরকারকে ভোট দেয়, সেই প্রত্যাশা পূরণে জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের গ্র্যান্ড বলরুমে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা তাদের দায়িত্ব। স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিনিধি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত এর দায় সরকারের ওপরই বর্তায়।
সরকারি কর্মকর্তা ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, একজন সরকারি চাকরিজীবী কর্মজীবনে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর চাকরি করার সুযোগ পান। কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মেয়াদ পাঁচ বছর। এই সময়ের পর আবারও জনগণের কাছে গিয়ে কাজের হিসাব দিতে হয় এবং পুনরায় নির্বাচিত হতে হয়। তাই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজের গুরুত্ব ও জবাবদিহিতা অনেক বেশি। মন্ত্রী বিশেষভাবে গ্রামীণ এলাকার মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক সাধারণ ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষ একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ পাওয়ার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে দিনের পর দিন ঘুরেও সেবা পান না। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে মানুষের সুবিধা-অসুবিধা দেখা এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করাই সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থা যেন সুষ্ঠু ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। মন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পদ্ধতি ভিন্ন হলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য একই—জনগণের সেবা করা। রাষ্ট্রের হাতে থাকা ক্ষমতাও মানুষের সেবা ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহার করতে হবে। মানুষের প্রয়োজন পূরণে সেই ক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে, মানুষের সেবা বাধাগ্রস্ত করতে নয়।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, এটি জাতীয় প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যক্রম। কিন্তু দেশের প্রকৃত জনসংখ্যার সঙ্গে নিবন্ধন তথ্যভান্ডারের তথ্যের বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। প্রায় ১৯ কোটি মানুষের দেশে নিবন্ধন ডাটাবেজে এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষের তথ্য থাকা উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই অসঙ্গতি দূর করে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও নির্ভুল, বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।
তার বক্তব্যে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট—শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই মানুষের সেবা নিশ্চিত হবে না। প্রযুক্তির পেছনে যারা কাজ করছেন, সেই মানুষদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। একটি সাধারণ জন্মসনদ পাওয়ার জন্য কোনো নাগরিককে যেন বারবার ইউনিয়ন পরিষদে যেতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা তুলে ধরেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা এবং উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—একটি জন্মসনদের মতো মৌলিক সেবা পেতে যদি একজন নাগরিককে বারবার সরকারি দপ্তরে ঘুরতে হয়, তাহলে ডিজিটাল সেবার আসল উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে? সরকারের পক্ষ থেকে এবার যে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে সেটি কতটা পরিবর্তন আনে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন