ঢাকা | |
সংবাদ শিরোনাম :
শেখ হাসিনাকে ফেরানোর প্রক্রিয়া জানালো ভারত পর্দার ‘মিনিস্টার ফাটাকেষ্ট’ এবার বাস্তবেও মন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্ব পাবে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি: জয়সোয়াল মাহমুদউল্লাহর ঝড়ো ইনিংসের পরও হারল বাংলাদেশ নভেম্বর ঢাকা সফরে আসছেন জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার স্কুল থেকে ছাত্রী অপহরণের চেষ্টাকালে নারী আটক: উদ্ধারে গিয়ে জনতার হামলায় আহত ৪ পুলিশ বিতাড়িত অপরাধীদের দেশে ফেরার সুযোগ নেই: প্রতিমন্ত্রী টুকু দুর্গাপূজায় ‘মদ খেয়ে নাচানাচি’ করলে ঘাড়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে: ফেনীর পুলিশ সুপার ক্যানসার চিকিৎসা সহজলভ্য করতে ১৭টি নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন যুক্ত হচ্ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশ্বের সেরা ৫০০ শহরের তালিকায় নেই ঢাকা

গাজা যুদ্ধের তিন বছর: হারিয়ে গেছে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযান প্রায় তিন বছর ধরে বদলে
  • আপলোড সময় : ৮ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪৪ সময়
  • আপডেট সময় : ৮ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪৪ সময়
গাজা যুদ্ধের তিন বছর: হারিয়ে গেছে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযান প্রায় তিন বছর ধরে বদলে দিয়েছে পুরো ভূখণ্ডের চেহারা। একের পর এক বিমান ও স্থল হামলায় ধ্বংস হয়েছে বাড়িঘর, সড়ক, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। বিপুল প্রাণহানির পাশাপাশি ঘর, শিক্ষা, চিকিৎসা, পানি, বিদ্যুৎ ও কর্মসংস্থানের সংকটে গাজার মানুষের স্বাভাবিক জীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত তিন বছরে ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ১ হাজার ৪৬২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।


প্রায় ২০ লাখ মানুষের এই ভূখণ্ডে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ স্থায়ী ঘরবাড়ি ছাড়া জীবন কাটাচ্ছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরেও গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষ জরুরি আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রায় ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছিল। এসব আশ্রয়কেন্দ্র বৃষ্টি, প্রচণ্ড গরম কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে খুব বেশি সুরক্ষা দিতে পারে না। বিছানা, আলো, রান্নার সরঞ্জাম ও স্যানিটেশন সুবিধারও তীব্র সংকট রয়েছে। পানির সংকটও দিন দিন ভয়াবহ হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, আগস্টের শুরুতে মূল্যায়ন করা পরিবারগুলোর ৯১ শতাংশ মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার পানির নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল। জুনে এই হার ছিল ৮৪ শতাংশ।


যুদ্ধের বড় ধাক্কা এসেছে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৩৬টি হাসপাতালই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১৯টি হাসপাতাল চালু থাকলেও কোনো হাসপাতালই পূর্ণ সক্ষমতায় চিকিৎসাসেবা দিতে পারছে না। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপকরণ ও জ্বালানির সংকটে ক্যানসার, কিডনি রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর মাত্র ১২ হাজার ৪০০ রোগীকে গাজার বাইরে চিকিৎসার জন্য নেওয়া সম্ভব হয়েছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আরও কয়েক হাজার মানুষের জরুরি বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন।


যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থাতেও। গাজায় কার্যকর বিদ্যুৎ গ্রিড না থাকায় হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি, ইঞ্জিন তেল ও যন্ত্রাংশের সংকট সেই ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নানা বাধা তৈরি হয়েছে। ফলে পানি সংগ্রহ, ফোন চার্জ দেওয়া, রান্না কিংবা গোসলের মতো সাধারণ কাজও সীমিত সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।


অর্থনীতিতেও নেমে এসেছে ভয়াবহ বিপর্যয়। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ শতাংশে। ২০২৫ সালে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন কমে মাত্র ২১২ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় মাত্র ১৭ শতাংশ। একই সময়ে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ২০২২ সালের তুলনায় মাত্র ৬ শতাংশে এবং নির্মাণ খাতের উৎপাদন মাত্র ১ শতাংশে নেমে এসেছে।


আয় কমার পাশাপাশি বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরেও পণ্যের দাম ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বেশি ছিল। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমেছে। বহু পরিবার মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নগদ অর্থের সংকটের কারণে অনেকে ডিজিটাল লেনদেন ও ই-ওয়ালেটের ওপর নির্ভর করছেন। শিক্ষাব্যবস্থার ওপরও যুদ্ধের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। ইউনিসেফের হিসাবে, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ লাখ শিশু টানা প্রায় তিন বছর নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করতে পারেনি। অনেক শিক্ষার্থী এখন তাঁবু কিংবা অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করছে। দীর্ঘদিনের এই শিক্ষাবিরতিতে শিশুদের মৌলিক দক্ষতা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।


যুদ্ধ গাজার ভৌগোলিক বাস্তবতাও বদলে দিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলের বিধিনিষেধের কারণে বিভিন্ন এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ গাজার রাফাহ এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ। যুদ্ধের সময় গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহতে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হলে জাতিসংঘের হিসাবে ৮ লাখের বেশি মানুষ আবারও বাস্তুচ্যুত হন। বর্তমানে রাফাহর পশ্চিমাঞ্চলের মাওয়াসি রাফাহ ছাড়া প্রায় পুরো এলাকাই ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে। ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের অনেকেই নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।


এদিকে গাজার প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নানা সংকটে পড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে হামাস গাজার প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির কাছে হস্তান্তরের কথা জানিয়েছিল। তবে সেই প্রক্রিয়া এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। নিরাপত্তাব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পুলিশের ওপর অন্তত ১২টি হামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৫৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৫ জন ছিলেন পুলিশ সদস্য। জাতিসংঘ বলেছে, বেসামরিক প্রশাসনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা বিশৃঙ্খলা বাড়িয়েছে এবং মানুষের নিরাপত্তা আরও দুর্বল করেছে।


এদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার তৃতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ইসরায়েলজুড়ে বিভিন্ন স্মরণ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে নিহতদের স্মরণ করা হয়। হামলার ঠিক তিন বছর আগে স্থানীয় সময় ভোর ৬টা ২৯ মিনিটে যে সময়ে হামলা শুরু হয়েছিল, সেই সময়েই গাজা সীমান্তের কাছে কিবুতজ কফার আজায় একটি শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।


আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ৭ অক্টোবরের হামলার তৃতীয় বার্ষিকী পালন করা হচ্ছে। ফলে তিন বছর আগের সেই ভয়াবহ হামলা আসন্ন নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তিন বছরের এই যুদ্ধে গাজার মানুষের কাছে সংঘাত এখন শুধু বোমা হামলা বা সামরিক অভিযানের নাম নয়। ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি, বিপর্যস্ত হয়েছে শিক্ষা ও চিকিৎসা, ভেঙে পড়েছে অর্থনীতি, সংকুচিত হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ। ফলে যুদ্ধ থামলেও গাজার মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আরও দীর্ঘ ও কঠিন পুনর্গঠনের প্রয়োজন হবে।

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
১০ বছর পর ভারতে ভিনি, ব্রাজিল দলে ৭ পরিবর্তনের আভাস

১০ বছর পর ভারতে ভিনি, ব্রাজিল দলে ৭ পরিবর্তনের আভাস