ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে এমন এক বিধ্বংসী বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র, যার নাম শুনলেই আঁতকে উঠতে পারে শত্রুপক্ষ। ‘সব বোমার মা’ নামে পরিচিত এই বিশাল বোমা মাটির ওপর ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইরানের পাহাড়ের গভীরে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো কি সত্যিই এই বোমা দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব? নাকি এত বড় বিস্ফোরণ ঘটিয়েও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে ওয়াশিংটন?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর চূড়ান্ত নির্দেশ দেন, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্রের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত বোমাগুলোর একটি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তারা। বোমাটির সামরিক নাম জিবিইউ-৪৩/বি, তবে বিশ্বজুড়ে এটি পরিচিত ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা ‘সব বোমার মা’ নামে। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের তীব্রতা যখন কিছুটা কমে আসছে, ঠিক তখনই এমন বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই পদক্ষেপ সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, এত শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে পারবে কি না।
জিবিইউ-৪৩/বি বোমাটির ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি, অর্থাৎ প্রায় ১০ টন। এর ভেতরে রয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কেজি বিস্ফোরক। বিশাল আকারের কারণে এটি সাধারণ যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপ করা যায় না। বোমাটি বহন ও নিক্ষেপের জন্য ব্যবহার করতে হয় সি-১৩০ হারকিউলিস পরিবহন বিমান। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে প্রথমবারের মতো বাস্তবে এই বোমা ব্যবহার করেছিল। সে সময় জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট খোরাসানের গুহা ও সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়। আফগান কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, ওই বিস্ফোরণে ৯৪ জন জঙ্গি নিহত হয়েছিল। তবে সে অভিযানের অভিজ্ঞতা থেকে ইরানের গভীরে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করার সক্ষমতা প্রমাণিত হয় না।
কারণ, এই বোমার মূল শক্তি মাটির ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করা। এটি ভূপৃষ্ঠের কিছুটা ওপরে বিস্ফোরিত হয়ে প্রচণ্ড অভিঘাত তরঙ্গ ও তীব্র বিস্ফোরণজনিত চাপ তৈরি করে। ফলে উন্মুক্ত স্থানে থাকা সেনা, সামরিক সরঞ্জাম, ভবন এবং গুহার প্রবেশমুখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু পাহাড়ের বহু গভীরে নির্মিত শক্তিশালী স্থাপনা ধ্বংস করার জন্য বোমাটি তৈরি করা হয়নি। ইরানের ফোরদো পারমাণবিক কেন্দ্রসহ পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। এসব স্থাপনা অত্যন্ত শক্তভাবে সুরক্ষিত হওয়ায় সেগুলো ধ্বংস করা কঠিন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘সব বোমার মা’ ব্যবহার করে স্থাপনাগুলোর ওপরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা প্রবেশপথ ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু তাতে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
গভীর ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রাগারে রয়েছে আরও বিশেষায়িত একটি বোমা—জিবিইউ-৫৭, যা ‘ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর’ নামে পরিচিত। এর ওজন প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কেজি। শক্ত ইস্পাতের তৈরি এই বোমা বিস্ফোরণের আগে মাটি বা পাথরের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ, মাটির ওপর ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য তৈরি এমওএবি এবং গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আঘাত হানার জন্য তৈরি এমওপি—দুটির কাজ এক নয়। এদিকে, ইরানের আকাশসীমায় ‘সব বোমার মা’ বহনকারী বিমান প্রবেশ করানোও বড় চ্যালেঞ্জ। বোমাটি বহন করতে ধীরগতির পরিবহন বিমান প্রয়োজন, যা উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। ফলে অস্ত্রটির বিশাল ধ্বংসক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে এটি ব্যবহার করা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সামরিক মহলে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এমন হামলায় ইরানের কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং হামলা নতুন করে সংঘাত উসকে দিতে পারে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও কঠিন করে তুলতে পারে। সব মিলিয়ে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সব বোমার মা’ ব্যবহারের সম্ভাবনা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি বড় কৌশলগত প্রশ্নও সামনে এনেছে। বিস্ফোরণের ভয়াবহতা দিয়ে কি সত্যিই ইরানকে চাপে ফেলা সম্ভব, নাকি এই পদক্ষেপ যুদ্ধকে আরও দীর্ঘ ও বিপজ্জনক করে তুলবে? শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন