জনগণ যদি রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়ে থাকেন, তাহলে সেই রায় উপেক্ষা করে কি সত্যিই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব? জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং ক্ষমতাসীন দলের অনীহা নিয়ে এবার প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ। তাঁর মতে, জনগণের প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে কিংবা সংস্কারের অঙ্গীকার থেকে সরে এসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাহলে কেন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে? আর রাষ্ট্র সংস্কারে কোন পথে এগোনোর কথা বলছেন তিনি?
সম্প্রতি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. আলী রীয়াজ এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটে নাগরিকেরা রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাই জনগণের সেই রায়কে সম্মান জানানো এবং জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব। আলী রীয়াজ মনে করেন, জুলাই জাতীয় সনদকে কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতার দলিল হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটি এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার, যেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহির আওতায় থাকবে এবং নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষিত হবে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্য এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নানা ঘাটতি রয়ে গেছে। এসব সমস্যা দূর করার লক্ষ্যেই রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পরও এর বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়াকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেছেন আলী রীয়াজ। তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান প্রক্রিয়ায় সংস্কারের বিভিন্ন দিক অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। পাশাপাশি দেখা দিতে পারে আইনি জটিলতাও। তিনি মনে করেন, সংবিধানের বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সংশোধনী আনলেই রাষ্ট্রের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন পুরো সংস্কারপ্রক্রিয়াকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম, প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা ও দায়িত্ব এবং জবাবদিহির ব্যবস্থায় সামগ্রিক পরিবর্তনের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আলী রীয়াজের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে গণভোটের মাধ্যমে পাওয়া জনগণের সম্মতি। তাঁর মতে, একই ভোটে নাগরিকেরা সরকার গঠনের পাশাপাশি রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষেও নিজেদের মতামত দিয়েছেন। ফলে জনগণের রায়ের একটি অংশ গ্রহণ করে অন্য অংশ উপেক্ষা করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে যেসব রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে, তাদের নৈতিক দায়িত্ব হলো নিজেদের দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা। জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, ড. আলী রীয়াজের বক্তব্যে রাষ্ট্র সংস্কার, গণভোটের রায় এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়গুলো নতুন করে সামনে এসেছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়া কীভাবে এগিয়ে যায়। কারণ, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন