২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের উদ্যোগে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠিত হলে এর মুখপাত্র হিসেবে সামনে আসেন সামান্তা শারমিন। বিভিন্ন কর্মসূচি, জনসংযোগ এবং টেলিভিশনের আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি তরুণদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের অবস্থান তুলে ধরেন। পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হলে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের একজন হিসেবেও পরিচিতি পান তিনি। কিন্তু অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করা সেই রাজনৈতিক দল থেকে সামান্তার পদত্যাগ নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। কেন তিনি দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা মতামত ও বিশ্লেষণ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সামান্তা শারমিনের মতাদর্শিক দূরত্ব তৈরি হয় প্রায় এক বছর আগে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এর আগেই এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির ২০ জনের বেশি নেতা পদত্যাগ করেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলেন সামান্তা শারমিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থী সামান্তা গতকাল দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। সেখানে জামায়াতের সঙ্গে জোট, নারীদের বিষয়ে দলের দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়গুলো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। এনসিপির নেতারা অবশ্য তাঁর পদত্যাগে বিস্মিত নন। তাঁদের ভাষ্য, জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্তের পর থেকেই সামান্তা দলীয় কার্যক্রমে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তাঁর পদত্যাগকে দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার আনুষ্ঠানিক পরিণতি হিসেবে দেখছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, এতে দলের বিশেষ কোনো লাভ বা ক্ষতি হয়নি।
জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে বিরোধ, রাজনৈতিক পর্ষদ থেকেও সরে দাঁড়ান
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির বেশ কয়েকজন তরুণ নেতা জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। তাঁদের মধ্যে সামান্তা শারমিন ছাড়াও ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা, সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম ও নাজিফা জান্নাত এবং লন্ডনফেরত চিকিৎসক তাসনিম জারা। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঐক্য গড়ার আলোচনা শুরু করলে প্রথম দিকে দল ছাড়েন তাসনিম জারা। পরে তিনি ঢাকার একটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। একই জোটের বিরোধিতা করে পরবর্তী সময়ে এনসিপি ছাড়েন আলোচিত নারী নেত্রী তাজনূভা জাবীন ও সৈয়দা নীলিমা দোলাসহ কেন্দ্রীয় কমিটির আরও কয়েকজন নেতা।
সামান্তা তখন দল না ছাড়লেও এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ান। এনসিপি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দলের শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময়ে তাঁকে রাজনৈতিক পর্ষদে ফিরে আসার অনুরোধ জানালেও তিনি রাজি হননি। তাঁর অবস্থান ছিল, জামায়াতের সঙ্গে জোট বহাল থাকলে তিনি পর্ষদে ফিরবেন না। পরে তাঁর জায়গায় অন্য একজন নারী নেত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে দলীয় কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে সামান্তার উপস্থিতি কমে যায়। সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করা হলে তাঁর পদেও পরিবর্তন আসে। আগে তিনি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক থাকলেও নতুন কমিটিতে তাঁকে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পদত্যাগপত্রে সামান্তার চার অভিযোগ
দলীয় প্রধান নাহিদ ইসলামকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সামান্তা শারমিন এনসিপি ছাড়ার পেছনে চারটি কারণ তুলে ধরেছেন।
প্রথমত, তাঁর অভিযোগ, এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান বা ‘লাইন’ পরিষ্কার না থাকায় দলটি জামায়াতের রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের এই দলটি বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের পক্ষে প্রতিক্রিয়াশীল ও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বড় একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপির স্বতন্ত্র রাজনীতি এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করেন তিনি।
তৃতীয়ত, তাঁর মতে, এনসিপির রাজনৈতিক ভূমিকা নারীবিরোধী ও রক্ষণশীল প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। নারীদের রাজনীতিতে পিছিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে জামায়াত ও অতি ডানপন্থী শক্তির রক্ষণশীল অবস্থানের সঙ্গে দলটির অবস্থান মিলে যাচ্ছে।
চতুর্থত, কাউন্সিল আয়োজন না করে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন সামান্তা। তাঁর ভাষ্য, এর মাধ্যমে দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে বারবার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হলেও এনসিপি নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনে আগ্রহ দেখায়নি। এ কারণেই দল থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তবে সামান্তার অভিযোগের কয়েকটি ব্যক্তিগত মতামত এবং কিছু বক্তব্য তথ্যগতভাবে সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার। তাঁর বক্তব্য, সামান্তা ব্যক্তিগতভাবে দলের অনেকের সঙ্গে আলোচনা করলেও দলীয় ফোরামে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেননি। সারোয়ার তুষার জানান, সম্প্রতি কমিটি পুনর্গঠনের আগে সামান্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কমিটিতে থাকার বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেননি। তবে কোনো নির্দিষ্ট পদের প্রত্যাশার কথাও জানাননি। তিনি বলেন, সামান্তা যেন ভিন্নমতের কারণে দলে অস্বস্তি বা চাপ অনুভব না করেন, সে বিষয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও বিভিন্ন সময়ে আশ্বস্ত করেছেন।
এনসিপিতে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষের সহাবস্থান রয়েছে উল্লেখ করে সারোয়ার তুষার বলেন, সামান্তা চাইলে জামায়াতবিরোধী অবস্থানের নেতাদের নেতৃত্ব দিতে পারতেন। তাঁর মতে, সামান্তা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। পদত্যাগের মাধ্যমে সেই নিষ্ক্রিয়তাই আনুষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। তাই তাঁর চলে যাওয়ায় দলের নতুন করে কোনো লাভ বা ক্ষতি দেখছেন না তাঁরা।
ফেসবুকে এনসিপির দুই নেত্রীর সমালোচনামূলক পোস্ট
সামান্তার পদত্যাগের পর এনসিপির কয়েকজন নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ইঙ্গিত করে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। যদিও তাঁদের পোস্টে সরাসরি সামান্তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। গতকাল রাতে এনসিপির দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা ফেসবুকে লেখেন, কেবল গণমাধ্যমে পরিচিত মুখ কিংবা বিপুল অনুসারী থাকা নারীরাই পুরো নারীসমাজের প্রতিনিধিত্বের দাবি করতে পারেন না। তাঁর অভিযোগ, শুরু থেকেই এনসিপিতে দু-একজন নারীকে সামনে আনা হয়েছে, আর অন্য নারীদের রাজনৈতিক পরিচিতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সীমিত করার পেছনে তাঁদেরই ভূমিকা ছিল। তিনি আরও লেখেন, দলের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে পরিচিতি পাওয়ার পর সুযোগ বুঝে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সৎ নেতৃত্বের পরিচয় হতে পারে না।
এনসিপির স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মনজিলা ঝুমাও ফেসবুকে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য, এনসিপির মাধ্যমে অনেকেই পরিচিতি ও রাজনৈতিক অবস্থান পেয়েছেন। জুলাইয়ের সময় দেশে বা বিদেশে অবস্থান করেও কেউ কেউ দলটির কারণে ‘জুলাই কন্যা’ হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। অথচ তাঁদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামান্তার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন অনেকে
অন্যদিকে, এনসিপির বাইরে থাকা কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও পরিচিত মুখ সামান্তা শারমিনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। কেউ কেউ তাঁকে ঘিরে অপপ্রচার ও সমালোচনারও প্রতিবাদ করেছেন। শুক্রবার সকালে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অলটারনেটিভসের সংগঠক মাহফুজ আলম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে সামান্তার পক্ষে কথা বলেন। তিনি লেখেন, ছয় সদস্যের বৈষম্যবিরোধী লিয়াজোঁ কমিটি থেকে চার শতাধিক সদস্যের জাতীয় নাগরিক কমিটি গড়ে তোলার পেছনে যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, তাঁদের নিয়ে অপপ্রচার ও অসম্মানজনক আচরণ দুঃখজনক। তাঁর মতে, দল গঠনের শুরু থেকেই তৎকালীন নেতৃত্বের কেউ কেউ এমন নজির তৈরি করেছিলেন। সামান্তাকে নিয়েও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। মাহফুজ আলম আরও বলেন, যাঁরা দলটির ভিত্তি গড়ে তুলতে পরিশ্রম করেছেন এবং জোটের কারণে সরে গেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানো উচিত। তা সম্ভব না হলে রাজনৈতিক সহাবস্থান ও সুস্থ চর্চার স্বার্থে অন্তত নীরব থাকা প্রয়োজন।
এদিকে, জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতায় গত বছরের ডিসেম্বরে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবের পদ ছেড়েছিলেন চিকিৎসক তাসনিম জারা। গতকাল রাতে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি সামান্তার প্রশংসা করেন। তাঁর ভাষ্য, সামান্তা সেই অল্প কয়েকজন মানুষের একজন, যাঁরা মানুষের কাছে গিয়ে তাঁদের জীবন ও বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করেন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ান। সামান্তার রাজনৈতিক পথচলা এখনো অনেক বাকি উল্লেখ করে জারা বলেন, রাজনীতিতে এমন মানুষের আরও বড় পরিসরে ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। সামান্তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় ফেসবুকে পোস্ট দেন বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলামও। তিনি দাবি করেন, সামান্তা শারমিনের উত্থাপিত অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়েছে এবং এনসিপি জামায়াতের ‘বি টিম’ হিসেবে কাজ করছে।
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন