মধুমতী নদীর দুই তীরে যতদূর চোখ যায়, শুধু মানুষের ঢল। এলাংখালী সেতু থেকে নদীর পাড়—কোথাও যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষসহ হাজারো মানুষ অপেক্ষায়, কখন শুরু হবে বহুদিনের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। অবশেষে ১২টি সুসজ্জিত নৌকা নিয়ে শুরু হয় জমজমাট প্রতিযোগিতা। বৈঠার ছন্দ আর বাইচাদের দুরন্ত গতিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
রোববার, ১ নভেম্বর বিকেলে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার এলাংখালী সেতুসংলগ্ন মধুমতী নদীতে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘মধুমতী নৌকাবাইচ-২০২৬’। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এই গ্রামীণ আয়োজন ঘিরে নদীর দুই তীরে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক দর্শক। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে প্রতিযোগিতা শুরু হলে চড়ন্দারের ঘণ্টার টং টং শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৈঠা চালাতে শুরু করেন বাইচারা। একের পর এক নৌকা ছুটে চলে নদীর বুক চিরে। বৈঠার ছন্দ, নৌকার গতি আর দর্শকদের উল্লাসে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ।
খুলনাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা মোট ১২টি সুসজ্জিত নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। নদীর দক্ষিণ পাশে রুইজানি এলাকা থেকে নৌকাগুলো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাত্রা শুরু করে। দুই তীরের লাখো দর্শক করতালি ও উল্লাসে উৎসাহ দেন প্রতিযোগীদের। নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে শুধু নদীর পাড়েই নয়, মহম্মদপুর উপজেলা সদরসহ আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামেও কয়েক দিন আগে থেকেই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকায় তৈরি হয় মিলনমেলা।
এবারের মধুমতী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। প্রতিযোগিতা শেষে প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন তিনি। মধুমতী নৌকাবাইচ ও মেলা-২০২৬ পরিচালনা কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় আর্থিক সহায়তা দেয় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং রূপায়ণ গ্রুপ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মধুমতী নৌকাবাইচ ও মেলা কমিটির সভাপতি এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অধ্যক্ষ মো. মৈমুর আলী মৃধা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল কাদের, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. হাসিনা মমতাজ, মাগুরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুনাহার এবং মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রীসহ আরও অনেকে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া সময়ে মধুমতীর এই নৌকাবাইচ আবারও মনে করিয়ে দিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্য কতটা প্রাণবন্ত। নদী, নৌকা আর মানুষের সম্মিলিত উচ্ছ্বাসে এক দিনের জন্য যেন ফিরে এসেছিল বাংলার চিরচেনা উৎসবের আমেজ।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন