নাটোরের নলডাঙ্গায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট ৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল। উদ্দেশ্য ছিল বিলাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু হাসপাতাল ভবন নির্মাণের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ না হওয়ায় সেই লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ভবন থাকলেও জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ফলে হাসপাতালের অধিকাংশ শয্যা বছরের পর বছর রোগীশূন্য পড়ে থাকছে।
হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ২৪টি। কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন। চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স, ফার্মাসিস্ট, টেকনিশিয়ান ও নিরাপত্তাকর্মীরও ঘাটতি রয়েছে। ১৩টি কর্মচারীর পদের বিপরীতে আছেন মাত্র একজন। নার্স রয়েছেন ১১ জন এবং পুরো হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে মাত্র তিনজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট দিয়ে।
ফলে উন্নত চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে আসা রোগীদের অনেককেই শেষ পর্যন্ত যেতে হচ্ছে নাটোর জেলা শহর কিংবা বিভাগীয় শহরের বড় হাসপাতালগুলোতে। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি নানা ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী এবং তাঁদের স্বজনেরা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে প্রায় তিন একর জমির ওপর ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০২১ সালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনটি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। উদ্বোধনের পর বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা চালু হলেও পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। আর হাসপাতালে গড়ে ভর্তি থাকেন ২০ থেকে ২৫ জন। তবে রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় সীমিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভোগান্তির চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। দুই বছর বয়সী শিশুকে জ্বর ও সর্দির চিকিৎসা করাতে হাসপাতালে এসেছিলেন রেখা খাতুন। তিনি জানান, দুই দিন ধরে সন্তানের জ্বর-সর্দি না কমায় সকালে হাসপাতালে আসেন। কিন্তু এসে দেখেন রোগীর দীর্ঘ লাইন। কখন চিকিৎসকের দেখা পাবেন, আর কখন ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। তাঁর অভিযোগ, চিকিৎসক কম থাকায় রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন হাঁটুব্যথা নিয়ে আসা আয়েশা বেগম। দুপুর হতে চললেও দীর্ঘ সিরিয়ালের কারণে চিকিৎসকের দেখা পাননি তিনি। তাঁর ভাষ্য, একজন চিকিৎসককে একসঙ্গে অনেক রোগী দেখতে হচ্ছে। ফলে অপেক্ষার সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। তবে সীমিত জনবল নিয়েই রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন নলডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম সায়েম। তিনি বলেন, হাসপাতালে নিয়মিত ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাফি, উচ্চ রক্তচাপ ও ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগ শনাক্তের পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রসব, মাতৃকালীন স্বাস্থ্যসেবা এবং গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। আগের তুলনায় বর্তমানে রোগীরা বেশি সেবা পাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান স্বীকার করেছেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় হাসপাতালটিতে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত জনবল বাড়ানো হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। প্রশ্ন উঠেছে, ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক হাসপাতাল যদি প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও কর্মী সংকটেই কার্যত অচল হয়ে থাকে, তাহলে এলাকার সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসা পাবে কীভাবে? ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত না করা গেলে নলডাঙ্গার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রত্যাশা অপূর্ণই থেকে যাবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন