বাংলাদেশে বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত খুলতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মোটরযান উৎপাদন থেকে শুরু করে জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, উচ্চগতির রেল এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ—এই খাতগুলোতে জাপানের বিনিয়োগ এলে বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা বদলে যেতে পারে? আর দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি থেকে কী সুবিধা পেতে পারে বাংলাদেশ?
টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামের সংলাপে এসব সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় বিকেলে জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে এবার আরও শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত পাঁচটি অগ্রাধিকার খাত হলো মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প।
তারেক রহমান জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে দেশটিতে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের কম। সর্বশেষ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১৩৬ কোটি মার্কিন ডলার। বিপরীতে জাপান থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ২১৬ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য। এই বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে বড় সুযোগ তৈরি করেছে চলতি বছর স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি। বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশের এটিই প্রথম এ ধরনের চুক্তি। এর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে, ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে।
মোটরযান উৎপাদন খাতে জাপানের বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, টয়োটা বাংলাদেশে যানবাহন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কাজ শুরুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি। জ্বালানি খাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তারেক রহমান। পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতেও জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে আগ্রহী বাংলাদেশ।
রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের প্রধান শহরগুলোকে যুক্ত করে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। এ প্রকল্পের পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি ও বিনিয়োগ সহায়তা চান তিনি।
এ ছাড়া কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ এবং আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপানি কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি। তবে বিনিয়োগ আকর্ষণে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। জাপানি কোম্পানিগুলোর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত অবকাঠামো এবং শুল্ক ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও নিশ্চয়তা দিতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী এবং বড় ভোক্তাবাজারকে বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে তুলে ধরেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে জাপানে উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনকারী বাংলাদেশি তরুণদের পাশাপাশি জাপানি ভাষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান পাশে ছিল। এখন দুই দেশের সামনে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পারস্পরিক সমৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা এবং জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির যৌথ আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বিনিয়োগ ও সহযোগিতামূলক প্রকল্পের ঘোষণা এবং সমঝোতা স্মারক বিনিময়ও করা হয়। এখন বড় প্রশ্ন, এই আলোচনায় উঠে আসা বিনিয়োগ পরিকল্পনাগুলো কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন গতি পেতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন