রাঙামাটির সাজেকে অবরোধ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাতায়াতের সুবিধার্থে ১২ ঘণ্টার জন্য অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দিয়েছে একটি সংগঠন। অন্যদিকে, একই সময়ে সশস্ত্র তৎপরতা ও নিরাপত্তাহীনতার প্রতিবাদে নতুন করে ১২ ঘণ্টার অবরোধ ডেকেছে আরেকটি সংগঠন। ফলে রোববার সাজেকে যানবাহন চলাচল ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
শনিবার রাতে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি জানায়, রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সাজেকে অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে। সংগঠনটির অভিযোগ, এলাকায় সহিংসতা, সশস্ত্র তৎপরতা, ভাইবোনছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে সশস্ত্র মহড়া এবং পর্যটকদের জিম্মি করে হামলার প্রতিবাদে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির সদস্য সচিব বিন্দু লাল চাকমার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে আরও অভিযোগ করা হয়, গত ১১ অক্টোবর থেকে সাজেকে অবরোধ চললেও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বন্ধ হয়নি। বরং ৩১ অক্টোবর কলাবুনিয়া এলাকায় নতুন করে গোলাগুলির ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতেই এই অবরোধ বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
তবে এর আগেই রোববারের জন্য অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দিয়েছিল ইউপিডিএফ-সমর্থিত সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। সংগঠনটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা শুক্রবার রাতে এক ভিডিও বার্তায় জানান, রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের যানবাহন চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আয়োজন কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানে ভিক্ষুদের যাতায়াতের জন্যও বিশেষ সুযোগ রাখার কথা জানানো হয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিহার বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে অবরোধকারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আলোচনার ভিত্তিতে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি তাদের অবরোধ চলাকালে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এবং সংবাদকর্মীদের যানবাহন চলাচলের সুযোগ রাখার কথা জানিয়েছে। তবে সাধারণ যানবাহন মালিক, শ্রমিক সংগঠন, পর্যটক ও স্থানীয়দের কর্মসূচি চলাকালে সড়কে যানবাহন না চালানোর অনুরোধ করেছে সংগঠনটি। সাজেকে চলমান সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিরোধ। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে গত ২২ অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। সাজেক থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করছে সংগঠন দুটি। তাদের অভিযোগ, সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
অবরোধের প্রভাবে সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধের সংকট বাড়ছে, পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে পর্যটন কার্যক্রম। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গত ২৬ অক্টোবর উজো বাজারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। সেখানে পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে কোনো ঐকমত্য হয়নি। ফলে অবরোধ প্রত্যাহার করা সম্ভব হয়নি। এদিকে, নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক পর্যটন এলাকায় পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। সব মিলিয়ে, এক পক্ষের অবরোধ শিথিল এবং অন্য পক্ষের নতুন অবরোধের ঘোষণায় সাজেকের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং পর্যটন কার্যক্রম কবে স্বাভাবিক হবে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন