বাচ্চাকাচ্চার মাঝে ঈমান সঞ্চারের পাশাপাশি একজন আদর্শ মুসলিম হিসেবে তার ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার কাজটিও করতে হবে বাবা-মাকে। আর সেটা করতে হবে একেবারে কচি বয়স থেকে।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আশেপাশে এমন বেশকিছু শিশু-কিশোর সাহাবি ছিলেন, বলতে গেলে যারা তার নিজ হাতে গড়া মানুষ। তার ভাস্তে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সাথে মদিনায় হিজরত করেন মাত্র ১৩ বছর বয়সে। ওইটুকুন বয়সে সবসময় তিনি নবীজির সাথে সাথে থাকতেন। যেকোনো অভিযানে নবীজির সাথে যেতেন। ছায়ার মতো লেগে থাকতেন। নবীজিও তাকে খুব আদর করতেন। নবীজি ওনার জন্য দুআ করে বলেছিলেন-
হে আমার রব, ইসলামের গভীর বুঝ দান করুন ওকে। কুরআনের তাফসির শিখিয়ে দেন। (সিলসিলাতুস সহীহাহ: ২৫৮৯)
আল্লাহ তার দুআ কবুল করেছিলেন। বয়সের চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞানী ও প্রাঞ্জ ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে এরকম আরও বেশ ক'জন কিশোর সাহাবি বেড়ে উঠেছেন। জান্নাতের সুখবর পাওয়া ১০ সাহাবির একজন জুবাইর ইবনু আওয়াম রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছেলে ছিলেন আবদুল্লাহ বিন জুবাইর। একেবারে ছোট বয়স থেকে তিনি নবীজির ঘরে মানুষ হয়েছেন বলা যায়। সরাসরি তার তত্ত্বাবধানে বড় হয়েছেন। আর আলি ইবনু আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু তো আক্ষরিক অর্থেই মানুষ হয়েছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার স্ত্রী খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার ঘরে।
তো, কথা হচ্ছে, বাচ্চাদের মাঝে যদি ছোট বয়স থেকে মুসলিম ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলেন, ভবিষ্যতে মুমিন হওয়া ওদের জন্য কঠিন হবে না। এই বয়সের নৈতিক শিক্ষাগুলো ওদের একটা ছাঁচে গড়ে দেয়। বড় হবার পর বিরোধী বা ভিনধর্মী আদর্শের আঘাতেও ওগুলো নষ্ট হয় না সহজে। বাচ্চাকে যদি আলিম বা ইসলামি আদর্শে সত্যিই বড় করতে চান, তাহলে পরে নয়, এখন থেকেই মাঠে নামুন। শৈশব পার হয়ে কৈশোরে পা দিয়ে বাচ্চারা যেন সাবলম্বী হয়, নিজের ভালোমন্দ কাজের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারে সেই ভিত গড়ে দেন।
ইসলামি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছেলেমেয়েরা সবকিছু বিচার-বিবেচনা করবে ইসলামের আলোকে। কুরআন-সুন্নাহ তাদের মাপকাঠি। মানব-জীবনের আত্মিক, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সব ধরনের বিষয়ের পর্যালোচনা আছে ইসলামি জ্ঞানভান্ডারে। সুতরাং, একজন ইসলামি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ইসলাম-বিরুদ্ধ কোনো মতবাদ বা আদর্শে নিজেকে ছেড়ে দিতে পারে না।
জীবন সম্বন্ধে পরিবারের বাবা-মা বা বয়োজ্যেষ্ঠদের অভিজ্ঞতা থাকে বেশি। চলার পথের ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতি তারা বেশি জানেন। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত তাদের পুড়িয়ে সোনা করেছে। সুতরাং, তারা যা বলবেন বা করতে বলবেন তা যে অধীনদের ভালোর জন্য, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। সন্তানদের এ-জিনিসগুলো এভাবে যৌক্তিকভাবে বোঝালে বড়দের মানার মনোভাব তৈরি হবে।
প্রায়ই দেখা যায়, 'হুজুর, আমার ছেলে বা মেয়ে কথা শুনছে না, ওকে পানি পড়া দেন, তাবিজ দেন'-এ ধরনের নালিশ নিয়ে বহু মা হুজুরদের পিছে ঘোরেন। অথচ বাড়িতে আপনি যদি ওকে নিয়মিত ইসলামি আদব শেখাতেন, তাহলে এরকম হতো না কক্ষনো। পরিবারে স্ত্রী যদি স্বামীর অনুগত থাকেন, সন্তান অবশ্যই বাবা-মায়ের অনুগত থাকবে। যে-স্ত্রী স্বামীর অনুগত, সে-স্ত্রী সন্তানের চোখে আলাদা মর্যাদায় ভূষিত। আর যে-সন্তান বাবা-মাকে মানে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশও সে মানে। এরকম একটি পরিবার দুনিয়াতেই জান্নাতের কিছুটা স্বাদ পেয়ে যায় বৈ কি।
আজকাল বহু জায়গায় মুসলিমেরা অন্যায়-অত্যাচারের শিকার। ঘর নেই, চুলো নেই- উদ্বাস্তুর জীবন তাদের। অন্যদিকে আমাদের শিশুরা হয়তো বসে থাকে স্মার্টফোনের নীল পর্দায়, কিংবা টিভি সেটে আঁঠার মতো লেগে থাকে। অসহায়দের সম্বন্ধে বেখবর তারা।
একজন ইসলামি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছেলেমেয়ে এমন হয় না। মুসলিম হিসেবে অপর দুখী মুসলিমের সাহায্য করা যে কতো বড় দায়িত্ব তার তালিম দেবেন ওদের। অসহায়ের সাহায্যে সম্ভাব্য সবকিছু করার তাগিদ দেবেন। আর এগুলো তো নিজে আগে করবেন অবশ্যই, তাহলে বাচ্চারা আপনাদের অনুসরণে আরও এগিয়ে যাবে। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
বিশ্বাসীদের দেখবে নিজেদের প্রতি রহমদিল। নিজেদের প্রতি প্রীতিপূর্ণ সদয় মনোভাব-যেন এক দেহ এক আত্মা। শরীরের একটা অংশ ভালো না থাকলে পুরো শরীরই যেমন না ঘুমিয়ে কাটায়, জ্বরে ভোগে, ঠিক তেমন।
(সহীহ বুখারী: ৬০১১)
অন্যের প্রতি হওয়া অবিচার যদি মুসলিম ছেলেমেয়েরা হাত দিয়ে দমাতে না পারে, এমনকি মুখের প্রতিবাদটাও করতে না পারে, অন্তত মন থেকে তারা যেন এগুলোকে ঘৃণা করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
কেউ কোনো খারাপ কিছু হতে দেখলে হাত দিয়ে দূর করবে। না পারলে মুখে প্রতিবাদ জানাবে। যদি তাও না পারে, তাহলে মনে মনে ঘৃণা করবে-এটা ঈমানের ন্যূনতম পর্যায়। (সহীহ মুসলিম: ৪৯)
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন