চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে ২২৬টি প্রতিষ্ঠানই মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন। এমন ফলাফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান, প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান এবং তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন জেলার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের দাসনাইপাড়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা থেকে এবার মাত্র একজন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয়। ১২ জন শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীকে পড়ালেও সে অকৃতকার্য হয়েছে।
খুলনার আসমা সারোয়ার ইসলামিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১০ জন শিক্ষক থাকলেও এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র দুজন। তাদের কেউই পাস করতে পারেনি। পঞ্চগড়ের বলরামহাট মডেল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে একজন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। বোদা সর্দারপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তিন পরীক্ষার্থীরও কেউ পাস করতে পারেনি। জামালপুরের কদমতলী কারিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ১১ জন শিক্ষক মাত্র তিনজন পরীক্ষার্থীকে পাঠদান করিয়েও কাউকে পাস করাতে পারেননি। নরসিংদীর সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদ্রাসায় ১৮ জন শিক্ষক থাকলেও ১৬ পরীক্ষার্থীর কেউ উত্তীর্ণ হয়নি। কিশোরগঞ্জের জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আটজন শিক্ষক ও পাঁচজন পরীক্ষার্থী থাকলেও একজনও পাস করেনি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু এসব প্রতিষ্ঠান নয়, সারা দেশে তিন শতাধিক ‘নামসর্বস্ব’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থী কম, নিয়মিত ক্লাস হয় না এবং শিক্ষক উপস্থিতিও সন্তোষজনক নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই এমপিওভুক্ত। এবার শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ১৭৮টি বেড়েছে। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩৪টি। এবারের ৩১২ প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ থেকেই ১৫ জনের কম শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। কোথাও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র একজন।
শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২২৬টি, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অর্থাৎ মোট শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭২ শতাংশই মাদ্রাসা। বিশেষ করে উপজেলা, গ্রাম, চর, হাওর, সীমান্তবর্তী ও দুর্গম এলাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বৈষম্য নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে শূন্য পাস করা ২২৬টি মাদ্রাসার প্রধানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। গত ১১ আগস্ট জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের লিখিত বক্তব্যসহ বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। অঞ্চলভেদে মাদ্রাসা প্রধানদের উপস্থিতির সময়সূচিও নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রধানদের ১৬ আগস্ট, রাজশাহীর ১৭ আগস্ট এবং রংপুরের ১৮ আগস্ট উপস্থিত হতে বলা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও সিলেটের ১৯ আগস্ট, খুলনা ও কুমিল্লার ২০ আগস্ট এবং বরিশালের ২৩ আগস্ট উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত একাডেমিক পর্যালোচনা, শিক্ষক উপস্থিতি যাচাই, পাঠদানের মান পরীক্ষা এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ প্রয়োজন। শিক্ষাবিদদের মতে, ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে কেন একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, তা তথ্যভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাবৈষম্য দূর করতে বিনিয়োগ, পরিকল্পনা এবং কার্যকর তদারকি বাড়াতে হবে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে একাধিকবার শূন্য পাসের ঘটনা ঘটেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও জানিয়েছেন, এমপিওর সুবিধা নেওয়ার পরও কোনো শিক্ষার্থী পাস না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সদুত্তর দিতে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিও সুবিধা বাতিলের বিষয়ও বিবেচনা করা হতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন