রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছে নতুন নেতৃত্বের সমীকরণ। দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আর তিনি বঙ্গভবনে গেলে স্বাভাবিকভাবেই শূন্য হবে বিএনপির মহাসচিবের পদ। ফলে এখন দলের ভেতরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি হিসেবে কে আসছেন? বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। এর মধ্যেই রাষ্ট্রপতি পদে দলের অবস্থান চূড়ান্ত করার পাশাপাশি মহাসচিব পদে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়েও বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
মহাসচিব পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মসূচি, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং গণমাধ্যমে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় উপস্থিতি এবং তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও তাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে এগিয়ে রাখছে বলে মনে করছেন দলের অনেকে।
তবে শুধু রিজভী নন, মহাসচিব পদে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে। দলের একটি অংশ মনে করছে, মহাসচিব শুধু সাংগঠনিক দায়িত্বের পদ নয়, বরং এটি দলের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদও। তাই স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলে নীতিনির্ধারণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় সম্ভব হতে পারে।
তবে এখনো মহাসচিব পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্থায়ীভাবে মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাতীয় কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ। কাউন্সিলের মাধ্যমেই মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার কথা। ফলে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক দায়িত্ব কাউকে দেওয়া হবে, নাকি নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে—সেটি দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। এদিকে রুহুল কবির রিজভী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি এখনো কিছু জানেন না।
অন্যদিকে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করার আলোচনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বা চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে দলটির। বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর। ফলে রাষ্ট্রপতির পদ অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। তবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব বাড়ানো হলে বঙ্গভবনের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক গুরুত্বও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি হিসেবে কে দায়িত্ব নিচ্ছেন, সেটি কেবল আনুষ্ঠানিক বিষয় হিসেবে থাকবে না; বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক কাঠামোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দলীয় সূত্রগুলোর মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দলের ভেতরে গ্রহণযোগ্যতার কারণেই মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদ সদস্য থাকার পাশাপাশি সরকারের প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে শুধু বিএনপির মহাসচিব পদই শূন্য হবে না, শূন্য হবে ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনও। আইন অনুযায়ী সেখানে উপনির্বাচন হওয়ার কথা। আর সেই উপনির্বাচন ঘিরেও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে। স্থানীয়ভাবে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির বিভিন্ন নেতার পাশাপাশি মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে ড. শামারুহ মির্জার নামও আলোচনায় এসেছে। তবে এ বিষয়ে দলের আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির সামনে একই সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে নতুন মহাসচিব কে হবেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কাকে প্রার্থী করা হবে এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার কাঠামো কী হবে—এসব বিষয় নিয়েই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে আলোচনা। আগামী কয়েক দিনের সিদ্ধান্তেই অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে বিএনপির নতুন নেতৃত্বের সমীকরণ।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন