যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় রানওয়ে ছাড়িয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অ্যামাজনের একটি কার্গো বিমান। এতে পাঁচজন নিহত এবং আরও পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
বোয়িং ৭৬৭-৩০০ মডেলের কার্গো বিমানটি স্থানীয় সময় মঙ্গলবার দুপুর ২টার (১৯:০০ GMT) ঠিক আগে দুর্ঘটনার শিকার হয়। বিমানটি পুয়ের্তো রিকোর সান হুয়ানের লুইস মুনোজ মারিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে এসেছিল। অবতরণের সময় বিমানটি মাটিতে থাকা কয়েকটি যানবাহনেও আঘাত করে।
অ্যামাজন জানিয়েছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
দুর্ঘটনার পর আগুন নেভানোর কর্মীরা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়ার সময় ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) মিয়ামি বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে শ্রম দিবসের (লেবার ডে) ছুটির সপ্তাহান্তে এই দুর্ঘটনা ঘটে, যা দেশটির বছরের ব্যস্ততম ভ্রমণ সময়গুলোর অন্যতম।
রোববার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে মিয়ামি-ডেড কাউন্টির মেয়র ড্যানিয়েলা লেভিন ক্যাভা বলেন, “অন্তত পাঁচজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন।”
তিনি জানান, দুর্ঘটনার “কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই” উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়।
মেয়র বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান মনোযোগ নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তিরা এবং চলমান উদ্ধার কার্যক্রমের দিকে।”
মিয়ামি ফায়ার বিভাগের প্রধান রেইড জাদাল্লাহ জানান, আহত পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মেয়র বলেন, আহত সবাইকে “অজ্ঞাত ধরনের আঘাত” নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
জাদাল্লাহ আরও জানান, মাটিতে থাকা কয়েকটি গাড়ির ভেতরে ও নিচে কয়েকজন আহত ব্যক্তি আটকা পড়েছিলেন। ফায়ার ও রেসকিউ কর্মীরা তাদের উদ্ধার করেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারী সংস্থা ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (এনটিএসবি) ঘটনাটি তদন্ত করবে। সংস্থাটি সোমবার এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করার পরিকল্পনা করেছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অ্যামাজনের এই ফ্লাইটটি নর্থ ক্যারোলাইনাভিত্তিক চার্টার বিমান সংস্থা ২১ এয়ার পরিচালনা করছিল। অবতরণের সময় বিমানটি মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তির্যক রানওয়ে ছাড়িয়ে যায় এবং বিমানবন্দরের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে গিয়ে থেমে অচল হয়ে পড়ে।
মিয়ামি-ডেড ফায়ার রেসকিউ জানিয়েছে, উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখতে পায়, দুর্ঘটনার ফলে বিমানটিতে আগুন ধরে গেছে এবং সেখান থেকে ব্যাপক ধোঁয়া ও আগুনের শিখা বের হচ্ছিল।
দুর্ঘটনাস্থলে ২০০ জনেরও বেশি অগ্নিনির্বাপক কর্মী কাজ করেন। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও সেখানে এখনও জ্বালানি তেল লিক হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাদাল্লাহ।
অ্যামাজন এক বিবৃতিতে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার কথা জানিয়েছে।
অ্যামাজনের করপোরেট গ্লোবাল মিডিয়া রিলেশনস বিভাগের পরিচালক কেলি ন্যান্টেল বলেন, “মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আজকের ঘটনায় পাঁচজনের প্রাণহানির খবর জেনে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত।”
তিনি আরও বলেন, “নিহতদের পরিবার, স্বজন এবং এই মর্মান্তিক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সবার প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা। বিমানটি ২১ এয়ার পরিচালনা করছিল এবং অবতরণের সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি এবং যেকোনো তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করব।”
বিবিসি এ ঘটনায় ২১ এয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পায়নি।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, অ্যামাজনের কার্গো বিমানটি রানওয়ের ব্যবহারযোগ্য অংশ ছাড়ার সময় ঘণ্টায় ১১২ নট বা প্রায় ১২৯ মাইল (২০৭ কিলোমিটার) গতিতে চলছিল।
একটি ব্লগ পোস্টে ফ্লাইটরাডার২৪ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর বিমানটি এমন একটি পার্কিং এলাকার কাছে গিয়ে থামে, যেটি অ্যামাজনের একটি গুদাম এবং অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়।
ওয়েবসাইটটির তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় মিয়ামি এলাকায় হালকা বজ্রঝড় এবং দমকা বাতাস ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বছরের অন্যতম ব্যস্ত ভ্রমণ সপ্তাহান্তে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার কারণে মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীদের মধ্যে ভোগান্তি দেখা দেয়।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন যাত্রী জানান, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় তারা হতাশ। দুর্ঘটনার পর বহু ফ্লাইট বাতিল কিংবা বিলম্বিত হয়।
বিমান সংস্থার কাউন্টারগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। যাত্রীরা তাদের ভ্রমণসূচি পরিবর্তন ও নতুন করে টিকিটের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ জানান, তাদের মিয়ামিতে অতিরিক্ত এক রাত অবস্থান করতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন নিরাপত্তা প্রশাসন (টিএসএ) জানিয়েছে, লেবার ডে বা শ্রম দিবসের ছুটিকে সামনে রেখে আগের এক সপ্তাহে দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বিমানে ভ্রমণকারী যাত্রীদের নিরাপত্তা তল্লাশি পরিচালনাকারী সংস্থা টিএসএ পূর্বাভাস দিয়েছিল, শুধু রোববারই প্রায় ২৩ লাখ মানুষ বিমানে ভ্রমণ করবেন।
মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (এমআইএ) মিয়ামি শহরের কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থিত এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর।
বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এমআইএ আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর এবং আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনে দ্বিতীয় ব্যস্ততম। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য যেকোনো বিমানবন্দরের তুলনায় এখান থেকে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে বেশি ফ্লাইট পরিচালিত হয়।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লোরিডায় আসা মোট আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীর প্রায় ৬০ শতাংশ এই বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ করেন।
বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন