ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যেই এবার দ্বীপগুলোর আশপাশে তেল ও গ্যাস উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং ফকল্যান্ডের কাছে তেল প্রকল্প বন্ধে নতুন আইন করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে মিলেই বলেন, ফকল্যান্ডের কাছে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হবে। আর্জেন্টিনার দাবি করা কিন্তু বর্তমানে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন ওই এলাকায় দেশটির অনুমতি ছাড়া পরিচালিত প্রকল্পকে তিনি আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন।
মিলেই জানান, বিদ্যমান আইনের আওতায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে একটি ডিক্রি জারি করা হবে। শুধু তেল প্রকল্পে সরাসরি যুক্ত প্রতিষ্ঠান নয়, তাদের অংশীদার, পরিচালক ও সরবরাহকারীদেরও শাস্তির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি আর্জেন্টিনার কংগ্রেসে ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিরক্ষা’ নামে একটি জরুরি বিল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। প্রস্তাবিত আইনে ফকল্যান্ডের আশপাশে আর্জেন্টিনার অনুমতি ছাড়া পরিচালিত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও তাদের সহযোগীদের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ থাকবে।
মিলেইয়ের ঘোষণার কেন্দ্রে রয়েছে সি লায়ন তেল প্রকল্প। ফকল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় সমুদ্র অববাহিকায় অবস্থিত এই প্রকল্পটি যুক্তরাজ্যের রকহপার এক্সপ্লোরেশন ও ইসরায়েলের নাভিতাস পেট্রোলিয়াম পরিচালনা করছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রকল্পটির উন্নয়নকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটির। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সি লায়ন তেলক্ষেত্রে আনুমানিক ১৭০ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে। এটি ফকল্যান্ডের উপকূল থেকে প্রায় ১৩০ মাইল দূরে অবস্থিত। তুলনায়, উত্তর সাগরে শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের পশ্চিমে অবস্থিত রোজব্যাংক তেলক্ষেত্রে প্রায় ৩০ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে।
মিলেই বলেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সি লায়ন প্রকল্পে তেল উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আর্জেন্টিনার স্বার্থের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ফকল্যান্ডের আশপাশের সমুদ্র থেকে আর্জেন্টিনার তেল উত্তোলনের বাস্তব সক্ষমতা তৈরি হয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। আর্জেন্টিনায় ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে ‘লাস মালভিনাস’ নামে অভিহিত করা হয়। দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে দুই দেশের বিরোধ বহু পুরোনো। ১৮৩৩ সাল থেকে যুক্তরাজ্য দ্বীপপুঞ্জটি নিয়ন্ত্রণ করছে। ১৯৮২ সালে এ বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সামরিক সদস্য, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সামরিক সদস্য এবং তিনজন দ্বীপবাসী নিহত হন।
তবে যুক্তরাজ্য ফকল্যান্ডের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। ব্রিটিশ সরকারের দাবি, দ্বীপবাসীদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। তারা যতদিন ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকতে চাইবে, ততদিন ফকল্যান্ড ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবেই থাকবে। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটেও ফকল্যান্ডের বাসিন্দারা ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থাকার পক্ষে ব্যাপক সমর্থন দেন। ওই ভোটে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকার পক্ষে মত দেন।
মিলেইয়ের সাম্প্রতিক অবস্থান আগের তুলনায় আরও কঠোর। এর আগে তিনি ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এবার তেল প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, তাদের অংশীদার ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিয়েছেন। একই ভাষণে আর্জেন্টিনার দক্ষিণাঞ্চলীয় তিয়েরা দেল ফুয়েগো প্রদেশে নৌঘাঁটি নির্মাণে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর কথাও জানান মিলেই। পাশাপাশি ওই অঞ্চলের যোগাযোগ ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ফকল্যান্ড ইস্যুতে মিলেইয়ের নতুন অবস্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থান পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফকল্যান্ড নিয়ে সম্ভাব্য সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যকে সহায়তা করবে কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি ট্রাম্প। বরং ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা না করার অভিযোগ নিয়ে কথা বলেন তিনি।
মিলেই তার ভাষণে দাবি করেন, ফকল্যান্ড প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা আর্জেন্টিনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব পরিস্থিতিতে এমন কিছু পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, যা আর্জেন্টিনার দাবির পক্ষে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, ফকল্যান্ড ইস্যুতে মিলেইয়ের কঠোর অবস্থানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। আগামী বছর আর্জেন্টিনায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। দেশটিতে ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের দাবি জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে তেল উত্তোলনের মতো অর্থনৈতিক বিষয়কে সামনে রেখে এই অবস্থান মিলেইকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতেও সহায়তা করতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন