জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম কানাইপুকুর। মেঠোপথ, শান্ত জলাশয় আর সবুজে ঘেরা এই নিভৃত গ্রামটি সন্ধ্যা নামতেই যেন বদলে যায়। আকাশজুড়ে উড়তে থাকে হাজারো পাখির ঝাঁক। মুহূর্তের মধ্যে গ্রামের মেহগনি, আমগাছ ও বাঁশঝাড় হয়ে ওঠে পাখিদের কোলাহলে মুখর।
স্থানীয়দের কাছে কানাইপুকুর এখন পরিচিত ‘পাখির গ্রাম’ বা ‘পাখি কলোনি’ নামে। প্রতি মৌসুমে এখানে আশ্রয় নেয় প্রায় ৫০ হাজার শামুকখোল। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় বক, কানিবক, পানকৌড়ি ও শঙ্খচিলসহ নানা প্রজাতির পাখি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই বিশাল পাখির আবাসস্থল গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে আব্দুস সামাদ মণ্ডল ও তার ছোট ভাই আব্দুস ছোবহান মণ্ডলের ঐতিহ্যবাহী বাড়ি। ২০০৭-০৮ সালের এক বর্ষায় প্রথমবার দুটি পথভোলা শামুকখোল এসে বাড়ির উঁচু গাছে আশ্রয় নেয়। পরিবারের সদস্যরা পাখি দুটিকে তাড়িয়ে না দিয়ে নিরাপদে থাকতে দেন।
সে বছর ছানা তুলে পাখিগুলো চলে গেলেও পরের বছর তারা ফিরে আসে আরও নতুন সঙ্গী নিয়ে। এরপর থেকে প্রতিবছরই কানাইপুকুরে পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে ছোট্ট একটি আশ্রয়স্থল পরিণত হয় বিশাল পাখি কলোনিতে। বর্তমানে এই পাখির আবাসস্থলটি দেখভাল করছেন মরহুম আব্দুস ছোবহান মণ্ডলের দুই ছেলে জহুরুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর আলম মণ্ডল এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের ভাষ্য, একসময় অল্প কয়েকটি পাখি এলেও এখন প্রতি মৌসুমে হাজার হাজার পাখি এখানে আসে।
প্রতিবছর এপ্রিল মাসে পাখিদের প্রথম ঝাঁক কানাইপুকুরে ফিরে আসে। এরপর গাছের ডালে বাসা তৈরি এবং ডিম পাড়ার প্রস্তুতি শুরু করে তারা। মে ও জুন মাসের প্রথমার্ধে ডিম ফুটে বের হয় ছানা। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের দিকে ছানারা উড়তে শেখে। তখন পুরো গ্রামজুড়ে পাখিদের আনাগোনায় তৈরি হয় এক অপরূপ দৃশ্য। শীতের মৌসুম শুরু হওয়ার আগে নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে ধীরে ধীরে পাখিগুলো কানাইপুকুর ছেড়ে অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমায়। আবার নতুন মৌসুমে তারা ফিরে আসে নিজেদের পরিচিত আশ্রয়ে।
কানাইপুকুর গ্রামের বাসিন্দা হাফিজার মণ্ডল বলেন, পাখিরা এখন গ্রামের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। সকালে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙা এবং সন্ধ্যায় হাজারো পাখির নীড়ে ফেরার দৃশ্য গ্রামবাসীর মনে আনন্দ তৈরি করে। ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির মুন্সী বলেন, কানাইপুকুরের পাখি কলোনি প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। পাখিদের আবাসস্থল রক্ষা এবং শিকার বন্ধে স্থানীয়দের ভূমিকা প্রশংসনীয়। এই অভয়ারণ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রকৃতি ও পাখিপ্রেমীদের কাছে কানাইপুকুর তাই এখন শুধু একটি গ্রাম নয়, বরং হাজারো পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। স্থানীয়দের সচেতনতা ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই পাখি কলোনি ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন