যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বেকারত্ব আর জলবায়ু সংকট—বিশ্ব যখন একের পর এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন এসব সমস্যা মোকাবিলায় তরুণদের শক্তি, প্রযুক্তি এবং সামাজিক ব্যবসাকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক সাইড ইভেন্টের ১১তম আসরে বক্তব্য দেন তিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা এবং ব্রাজিলের মন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
বক্তব্যে বর্তমান বিশ্ব কূটনীতির ভাষা নিয়েও কথা বলেন ড. ইউনূস। তার মতে, কূটনীতিতে অনেক সময় শব্দের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যায়। ফলে যুদ্ধ ও শান্তির মতো মৌলিক বিষয় নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন মানুষের কাছে এসব শব্দের প্রকৃত অর্থ আরও স্পষ্ট করে তুলতে ভূমিকা রাখবে। ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে ‘গ্রামীণ আমেরিকা’র কার্যক্রমের উদাহরণ দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে নিউইয়র্কে মাত্র ৫০০ ডলারের সর্বোচ্চ ঋণসীমা দিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন পর্যন্ত ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। ঋণ পরিশোধের হারও প্রায় শতভাগ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের এবং পুরুষদেরও এই উদ্যোগের আওতায় আনার কথা জানান তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে আমানত গ্রহণ ও সঞ্চয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন অধ্যাপক ইউনূস। সামাজিক ব্যবসার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, অর্থ উপার্জন মানুষকে আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু অন্য মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারার আনন্দ আলাদা। তার মতে, সামাজিক ব্যবসার মূল লক্ষ্য শুধু মুনাফা করা নয়; বরং মানুষের বাস্তব সমস্যা সমাধানে ব্যবসাকে একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা।
বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে ড. ইউনূস জানান, সামাজিক ব্যবসার আওতায় দেশে ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। প্রযুক্তির সহায়তায় দূরবর্তী এলাকার মানুষ চিকিৎসকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। পাশাপাশি স্বয়ংসম্পূর্ণ চক্ষু হাসপাতালের একটি নেটওয়ার্কও গড়ে উঠেছে, যেখানে অর্জিত উদ্বৃত্ত আয় নতুন হাসপাতাল তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তরুণদের নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন ড. ইউনূস। তার মতে, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় তরুণদের চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তোলে। অথচ মানুষ জন্মগতভাবেই উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা নিয়ে আসে। এই ধারণাকে সামনে রেখে আগামী ডিসেম্বর থেকে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’র কার্যক্রম শুরু করার কথা জানান তিনি। ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ—এই লক্ষ্য সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়টি তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করবে বলে জানান অধ্যাপক ইউনূস।
সবশেষে তিনি বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামাজিক ব্যবসা, প্রযুক্তি ও তরুণদের সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে এমন একটি বিশ্বের প্রত্যাশা, যেখানে ব্যবসা শুধু মুনাফা অর্জনের জন্য নয়, মানুষের জীবন ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্যও কাজ করবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন