ঢাকা | |

ছয় বছরে ৩৯১২ অপহরণ, সবচেয়ে বেশি ২০২৫ সালে

কেউ বাড়ি থেকে বের হয়েছেন, কিন্তু আর ফেরেননি। কারও পরিবারের কাছে এসেছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণের দাবি। আবার কেউ
  • আপলোড সময় : ৬ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১০:৩০ সময়
  • আপডেট সময় : ৬ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১০:৩০ সময়
ছয় বছরে ৩৯১২ অপহরণ, সবচেয়ে বেশি ২০২৫ সালে

কেউ বাড়ি থেকে বের হয়েছেন, কিন্তু আর ফেরেননি। কারও পরিবারের কাছে এসেছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণের দাবি। আবার কেউ অপহরণের কয়েক ঘণ্টা পরই ফিরেছেন লাশ হয়ে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দেশে অপহরণের ঘটনা যেন থামছেই না। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু একটি বছরেই অপহরণের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। আর চলতি বছরেও পরিস্থিতির বড় কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।


পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৯১২টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ সালে। ওই এক বছরেই ১ হাজার ১০২ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় মাত্র এক বছরের ব্যবধানে অপহরণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৭১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, চলতি বছরেও অপহরণের ঘটনা কমেনি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে অপহরণের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে। অর্থাৎ বছরের শেষ দিকে এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতির পরিবর্তনটা আরও স্পষ্ট হয়। ২০২১ সালে দেশে অপহরণের ঘটনা ছিল ৪৪৫টি। ২০২২ সালে ৪৬০টি এবং ২০২৩ সালে ৪৬৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪২টিতে। আর ২০২৫ সালে এক লাফে তা পৌঁছে যায় ১ হাজার ১০২টিতে। অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অপহরণের ঘটনা বেড়েছে ৬৫৭টি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই বৃদ্ধি দেড় গুণেরও বেশি। বিশেষ করে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যে হারে অপহরণ বেড়েছে, সেটিই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে।


পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, সব অপহরণের পেছনে একই কারণ কাজ করছে না। মুক্তিপণ আদায় অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলেও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত বিরোধ, প্রতিশোধ, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধ এবং ডিজিটাল যোগাযোগের অপব্যবহার থেকেও অপহরণের ঘটনা ঘটছে। অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, অপহরণের প্রতিটি ঘটনাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। কারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং নেপথ্যে কারা রয়েছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।


তার মতে, অনেক অপহরণের ঘটনায় মামলা বা সাধারণ ডায়েরিতে রাজনৈতিক রং লাগার অভিযোগ রয়েছে। এতে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে পুলিশের পরিসংখ্যানের বাইরেও প্রকৃত অপহরণের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবের কারণে ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতে পারে না। ফলে নথিভুক্ত পরিসংখ্যান হয়তো পুরো পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরছে না।


অপহরণের পর হত্যার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। কক্সবাজারের চকরিয়ায় অপহরণের প্রায় চার ঘণ্টা পর মহাসড়কের পাশ থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক ছাত্রদল নেতার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় আসে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ওই ঘটনা আর্থিক কারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে বলে উঠে এসেছে।


অন্যদিকে মুক্তিপণ দাবির ঘটনাও সামনে আসছে নিয়মিত। চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর তার পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগ ওঠে। গাইবান্ধাতেও অপহরণের পর মুক্তিপণ চাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে নির্যাতনের পর ৬০ হাজার টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সারা দেশে অপহরণের ঘটনায় ৬৯১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই হয়েছে ১২৯টি মামলা। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনটি করে অপহরণের মামলা হয়েছে সারা দেশে।


সব মিলিয়ে অপহরণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মামলা ও গ্রেপ্তার করলেই হবে না। অপহরণকারী চক্র শনাক্ত করা, মুক্তিপণের অর্থের উৎস ও লেনদেনের ওপর নজরদারি, ডিজিটাল যোগাযোগের অপব্যবহার ঠেকানো এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে দ্রুত সমন্বিত অভিযান জোরদার করতে হবে। কারণ একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের অপেক্ষা শুধু সময়ের সঙ্গে দীর্ঘ হয় না—প্রতিটি মুহূর্তে বাড়তে থাকে আতঙ্ক। আর দেশে অপহরণের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে—এই অপরাধ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আরও দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ এখন কতটা জরুরি?

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
পদত্যাগ করেছেন বিএনপির এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, আসন শূন্য ঘোষণা

পদত্যাগ করেছেন বিএনপির এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, আসন শূন্য ঘোষণা