ঢাকা | |

৬০ টাকার ডাব ঢাকায় বিক্রি হয় ২০০ টাকায়!

গাছ থেকে যে ডাব কিনতে হচ্ছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকায়, সেটিই রাজধানীর বাজারে পৌঁছাতেই হয়ে যাচ্ছে ১৬০
  • আপলোড সময় : ৬ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২:২২ সময়
  • আপডেট সময় : ৬ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২:২২ সময়
৬০ টাকার ডাব ঢাকায় বিক্রি হয় ২০০ টাকায়!

গাছ থেকে যে ডাব কিনতে হচ্ছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকায়, সেটিই রাজধানীর বাজারে পৌঁছাতেই হয়ে যাচ্ছে ১৬০ থেকে ২২০ টাকা! আকারভেদে কোথাও আবার দাম উঠছে আরও বেশি। অর্থাৎ গাছ থেকে ক্রেতার হাতে পৌঁছানোর আগেই একটি ডাবের দাম বেড়ে যাচ্ছে প্রায় তিন গুণ। প্রশ্ন হলো—এই বাড়তি টাকার বড় অংশ যাচ্ছে কার পকেটে?


একসময় গরমের দিনে তৃষ্ণা মেটানোর সবচেয়ে সহজলভ্য প্রাকৃতিক পানীয়গুলোর একটি ছিল ডাবের পানি। অসুস্থ রোগীর পথ্য হিসেবেও চিকিৎসকের পরামর্শে ডাব কেনা হতো। কিন্তু এখন সেই ডাব কিনতেই রাজধানীর ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে দেড়শ থেকে দুইশ টাকারও বেশি। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কাওরান বাজারে প্রায় প্রতিদিন রাতে দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ ডাব আসছে। সদরঘাটের পাইকারি বাজারেও নদীপথে বিভিন্ন এলাকা থেকে ডাব পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন এলাকা থেকে ঢাকার বাজার পর্যন্ত কয়েক ধাপে হাতবদলের কারণে দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।


দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় গাছমালিকের কাছ থেকে আকারভেদে একটি ডাব গড়ে ৬০ থেকে ৭০ টাকায় কেনা হচ্ছে। এরপর স্থানীয় ব্যাপারি, পাইকার, আড়তদার এবং খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে সেটিই রাজধানীর ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে। লক্ষ্মীপুরের চিত্র আরও বিস্ময়কর। সেখানে গাছ থেকে ২৮ থেকে ৩০ টাকায় কেনা একটি ডাব ঢাকার পাইকারি বাজারে গড়ে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কয়েক ধাপে হাতবদল হওয়ার কারণে উৎপাদন এলাকা থেকে রাজধানীর বাজারে পৌঁছাতে ডাবের দাম তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।


তবে শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করলেই পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছরে দেশে ডাবের চাহিদা বেড়েছে। গরমের সময় সাধারণ মানুষের চাহিদার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্যও ডাব কেনার প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে হাসপাতালকেন্দ্রিক চাহিদা অনেক ক্ষেত্রে বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডাবের সরবরাহ বাড়ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।


এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পরিবহন ব্যয়। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চল থেকে প্রায় ৩ হাজার ডাবের একটি ট্রাক ঢাকায় আনতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া লাগে। অর্থাৎ শুধু পরিবহন খরচেই প্রতি ডাবে প্রায় ১২ থেকে ১৫ টাকা যোগ হচ্ছে। এরপর রয়েছে শ্রমিকের মজুরি, ডাব ওঠানো-নামানোর খরচ, আড়ত খরচ, বাছাই, নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, খুচরা বিক্রেতার পরিবহন ব্যয় এবং ব্যবসায়ীদের মুনাফা। একের পর এক খরচ যুক্ত হতে হতে উৎপাদন এলাকার ৬০ থেকে ৭০ টাকার ডাব ঢাকার বাজারে গিয়ে ২০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।


ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামানও বাজার ব্যবস্থাপনায় সমস্যা থাকার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, আড়ত, পাইকার, ফড়িয়া ও খুচরা পর্যায়ে মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা না থাকায় কৃষক যেমন প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না, তেমনি ভোক্তাকেও বেশি টাকা দিতে হচ্ছে।


ঢাকার ডাবের বাজার মূলত দেশের দক্ষিণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পিরোজপুর ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন রাজধানীতে ডাব আসে। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর অন্যতম বড় উৎপাদন অঞ্চল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরে প্রায় ৩০ লাখ ৭৫ হাজার নারিকেলগাছ রয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৫৬৩ হেক্টর জমিতে নারিকেল চাষ হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় নারিকেল উৎপাদন হয়েছে ৫৫ হাজার মেট্রিক টন। শুধু লক্ষ্মীপুর থেকেই প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ ট্রাক ডাব ঢাকায় আসে। প্রতিটি ট্রাকে থাকতে পারে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ডাব।


অর্থাৎ রাজধানীর বাজারে ডাবের সরবরাহ কম নয়। তবুও গাছমালিকের কাছ থেকে কয়েক দশ টাকায় কেনা ডাব কেন ভোক্তার হাতে পৌঁছে দুইশ টাকার কাছাকাছি যাচ্ছে—সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উৎপাদনকারী ও ভোক্তার মাঝখানে যত বেশি স্তর, দাম বাড়ার সুযোগও তত বেশি। তাই ডাবের এই অস্বাভাবিক মূল্য ব্যবধান কমাতে হলে শুধু বাজারে অভিযান নয়, উৎপাদন এলাকা থেকে রাজধানীর খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় কোথায় কত খরচ ও মুনাফা যুক্ত হচ্ছে, তার স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করাও জরুরি।

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
পদত্যাগ করেছেন বিএনপির এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, আসন শূন্য ঘোষণা

পদত্যাগ করেছেন বিএনপির এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, আসন শূন্য ঘোষণা