২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলন চলাকালে পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সীমিত করার নির্দেশ এসেছিল তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের কাছ থেকে—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এমন তথ্য জানিয়েছেন বিটিআরসির উপপরিচালক মাহদী আহমদ। শুধু তাই নয়, পরবর্তী সময়ে আরও বিশ্ববিদ্যালয়ে নেটওয়ার্ক বন্ধের নির্দেশনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি সেবার ক্যাশ সার্ভার বন্ধ রাখার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে। জুলাই আন্দোলনের সময় যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, আর সেই সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে তৎকালীন সরকারের কোন কোন ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে?
রোববার ১১ অক্টোবর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেন মাহদী আহমদ। মামলাটি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। সজীব ওয়াজেদ জয় পলাতক রয়েছেন, আর পলক এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। জবানবন্দিতে মাহদী আহমদ জানান, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার পর বিটিআরসির তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজার রহমান তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করেন। ওই ফোনে তাঁকে জানানো হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বিটিআরসির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মহিউদ্দিন আহমেদকে পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ বা সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। মাহদী আহমদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরদিন সকালে সাময়িকভাবে নেটওয়ার্ক চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ১৬ জুলাই দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের নেটওয়ার্ক বন্ধের নির্দেশনা আসে বলে জানান তিনি।
মাহদী আহমদ আরও বলেন, ওই দিন সন্ধ্যায় বিটিআরসিতে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তাঁর জবানবন্দি অনুযায়ী, সেদিন নেটওয়ার্ক বন্ধের সিদ্ধান্তের বিষয়ে নথিতে পরে ভূতাপেক্ষ অনুমোদন নেওয়া হয়। তবে সারাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশনা সম্পর্কে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন মাহদী আহমদ। তিনি জানান, দেশব্যাপী মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ কে দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই। তবে ২৮ জুলাই অনুষ্ঠিত একটি সভার মাধ্যমে মোবাইল ইন্টারনেট পুনরায় চালুর নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি তিনি জানেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সভায় জুনাইদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে চারটি মোবাইল অপারেটরের তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের নেটওয়ার্ক চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়। সভায় তৎকালীন জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানও উপস্থিত ছিলেন। একই সভায় বিটিআরসিকে ফেসবুক, টিকটক, আকামাই ও বাইসানের ক্যাশ সার্ভার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন মাহদী আহমদ। পরে ৩১ জুলাই পলক এসব ক্যাশ সার্ভার আবার চালুর নির্দেশ দেন বলেও জানান তিনি।
দেশব্যাপী মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে তিনি আবারও বলেন, এ ধরনের নির্দেশনার বিষয়ে তাঁর প্রত্যক্ষ জ্ঞান নেই। তিনি শুধু ইন্টারনেট চালুর নির্দেশনা সম্পর্কে জানেন, যা ২৮ জুলাইয়ের সভার সঙ্গে সম্পর্কিত। জুলাই আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়ে এই জবানবন্দি মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে সামনে এসেছে। তবে কোন নির্দেশ কীভাবে কার্যকর হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় কী—সেসব বিষয় আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন