চীনের বিশাল বাঁধের জবাবে ভারতে তৈরি হচ্ছে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। কিন্তু যে নদীকে ঘিরে দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতা, সেই নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগেই এখন নিজেদের ভিটেমাটি, সংস্কৃতি ও জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় রাস্তায় নেমেছেন ভারতের আদিবাসীরা। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়েছে যে বিক্ষোভ সামাল দিতে নিরাপত্তা বাহিনীও মোতায়েন করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্প কি বাস্তবায়িত হবে, নাকি স্থানীয়দের আন্দোলনের মুখে পিছু হটবে সরকার?
ভারতের অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং নদীর ওপর ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনের তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পাল্টা কৌশল হিসেবে ভারত এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। তবে প্রকল্পটি ঘিরে স্থানীয় আদি সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত সিয়াং নদী অরুণাচল প্রদেশ পেরিয়ে আসামে প্রবেশ করে এবং অন্যান্য নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নাম ধারণ করে। পরে এই নদী বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে নদীর উজানে চীন ও ভারতের বড় বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা ভাটির অঞ্চলের পানির নিরাপত্তা, বন্যা পরিস্থিতি এবং পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের মেডোগ এলাকায় প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ শুরু করে। ভারতের আশঙ্কা, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা তৈরি হলে ভাটির দেশ হিসেবে তাদের জলনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সিয়াং নদীতে প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি ধারণক্ষমতার জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে ভারত।
তবে কৌশলগত হিসাবের বাইরে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগও কম নয়। আদি সম্প্রদায়ের মানুষের আশঙ্কা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তাদের পূর্বপুরুষের বসতভিটা, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, কৃষিজমি এবং জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণেই প্রকল্প বাতিলের দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু জানিয়েছেন, জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে প্রকল্প নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। তাঁর দাবি, প্রকল্প সম্পর্কে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। তবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইংকিয়ং সফরের সময় তাঁর গাড়িবহর বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সংগঠন আদি বানে কেবাং প্রকল্প বাতিল এবং প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে সিয়াং ইন্ডিজিনাস ফারমার্স ফোরাম ও অল আদি ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন ঐতিহ্যবাহী কেবাং ব্যবস্থার মাধ্যমে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অরুণাচলে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর দুই কোম্পানি এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত বাহিনী পাঠিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সাংবাদিক তোঙ্গাম রিনার ভাষ্য অনুযায়ী, সিয়াং নদীতে প্রকল্প নির্মাণের বিরোধিতা প্রায় চার দশকের পুরোনো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ঘটনায় ক্ষোভ বেড়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করে, নদীর প্রকৃতি ও স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে চীনের প্রস্তাবিত বাঁধের এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় মেডোগ অঞ্চলে সক্রিয় পাইঝেন ভূগর্ভস্থ চ্যুতির উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এত বড় অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্প, আকস্মিক বন্যা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সব মিলিয়ে সিয়াং নদীকে ঘিরে ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখন স্থানীয় মানুষের অধিকার ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। একদিকে ভারতের জলনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা, অন্যদিকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও ঐতিহ্য রক্ষার দাবি—এই দুইয়ের মধ্যে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন