ভিড়ে ঠাসা মেট্রোরেল, চারপাশে অসংখ্য যাত্রী। শরীরটা অসুস্থ হয়ে পড়ায় বসার জন্য কয়েকজনের কাছে অনুরোধ করেছিলেন এক প্রবীণ শিক্ষক। কিন্তু অভিযোগ, কেউ তাঁকে বসার সুযোগ দেননি। কিছুক্ষণের মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে যান তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। বাবার মৃত্যুর পর একটি আক্ষেপই বারবার মনে পড়ছে ছেলে নাকিবুর রহমানের—কেউ যদি তাঁর বাবাকে একটু বসতে দিতেন!
গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে শাহবাগ থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত নজীবুর রহমান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর ছেলে নাকিবুর রহমান জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। নাকিবুর রহমান জানান, ওই দিন সকালে তাঁর বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে বেলা তিনটার দিকে তিনি শাহবাগ মেট্রোস্টেশন থেকে উত্তরের উদ্দেশে ট্রেনে ওঠেন। সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক।
কয়েক দিনের ছুটি শেষে সেদিন মেট্রোরেলে যাত্রীর চাপ ছিল অনেক বেশি। বসার আসন না পেয়ে বাবা ও তাঁর সহকর্মী দুজনই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলিতে একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। নাকিবুরের ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা সাড়ে তিনটার দিকে শেওড়াপাড়া এলাকায় পৌঁছানোর সময় তাঁর বাবা অসুস্থ বোধ করেন। এ অবস্থায় বসার জন্য আসনে থাকা যাত্রীদের কাছে কয়েকবার অনুরোধ জানালেও কেউ সাড়া দেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এর এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যেই মেঝেতে পড়ে যান নজীবুর রহমান।
ঘটনাটি বুঝতে পেরে আশপাশের কয়েকজন যাত্রী তাঁকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। পরে শোরগোল শুনে তাঁর সহকর্মীও সেখানে আসেন। যাত্রীদের সহায়তায় তাঁকে পরীক্ষা করে জীবিত না থাকার বিষয়টি বুঝতে পারেন বলে জানান নাকিবুরের বাবা-সহযাত্রী। নজীবুর রহমানের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ছিল। তাঁকে মেট্রোরেলের উত্তরা উত্তর স্টেশনে নামানোর পর আনসার সদস্যদের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান তাঁর ছেলে। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
বাবার শেষ সময়ে পরিবারের কেউ পাশে থাকতে পারেননি। নাকিবুরের মা ও ছোট ভাই ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে ছিলেন। বিমানের টিকিটসংক্রান্ত জটিলতায় তাঁরা সময়মতো দেশে ফিরতে পারেননি। তাঁর বোন পরিবার নিয়ে নিউজিল্যান্ডে থাকেন, আরেক ভাইও সেখানে পড়াশোনা করেন। ফলে পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতিতেই বরিশালের গৌরনদী উপজেলার গ্রামের বাড়িতে নজীবুর রহমানকে দাফন করা হয়।
বাবার মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে নাকিবুর রহমান বলেন, ছেলে হিসেবে সারা জীবন তাঁর একটি আক্ষেপ থেকে যাবে—কেউ যদি তাঁর বাবাকে বসতে দিতেন, তাহলে হয়তো তাঁকে এভাবে মেঝেতে পড়ে যেতে হতো না। অন্তত শেষ মুহূর্তে কেউ তাঁর বাবার মাথাটা কোলে তুলে নিতে পারতেন।
তবে কাউকে সরাসরি দোষারোপ করতে চান না নাকিবুর। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি যেকোনো মানুষের জীবনেই আসতে পারে। বয়স্ক মানুষের প্রতি সবার সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাঁদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করা উচিত। এই ঘটনা আবারও জনপরিসরে অসুস্থ ও প্রবীণ মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ব্যস্ততার মধ্যে সামান্য সহমর্মিতা, প্রয়োজনে একটি আসন ছেড়ে দেওয়া কিংবা অসুস্থ কাউকে দ্রুত সাহায্য করা—এমন ছোট উদ্যোগও সংকটের মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন