মুহূর্তের একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ বদলে দিয়েছে এক তরুণের পুরো জীবন। যে বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে নতুন সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন, সেই বাড়িই পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় স্ত্রীসহ পরিবারের ১২ সদস্যকে হারিয়েছেন ইরানের নাগরিক হামেদ মির্জাঈ। স্বজনদের হারিয়ে আজও ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির সামনে ফিরে যান তিনি। কিন্তু সেখানে আর ফিরে পাওয়ার মতো কেউ নেই।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি আবাসিক ভবনে এই হামলার ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন হামেদের ২৬ বছর বয়সী স্ত্রী মোহাদেসেহ। বিয়ের মাত্র এক বছর হয়েছিল তাদের। নতুন সংসার সাজানোর পাশাপাশি সন্তান নেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন এই তরুণ দম্পতি। কিন্তু একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় তাদের সব স্বপ্ন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হামেদ জানান, ঘটনার দিন দুপুরে কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। দুপুর আড়াইটার দিকে স্ত্রী ফোন করে ফেরার পথে মাথাব্যথার ওষুধ নিয়ে আসতে বলেন। স্ত্রীকে কোন ওষুধ প্রয়োজন, তা জানতে ফোন করলেও সংযোগ পাননি তিনি।
বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে থাকতেই হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান হামেদ। এরপরই আঘাত হানে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র। বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী, বাবা-মা ও দাদাকে ফোন করার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু কারও সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারেননি। এরপর কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আরও পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে তাদের আবাসিক ভবনে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে হামেদ দেখতে পান, একসময়কার বিশাল ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। চারপাশে আগুন, ধোঁয়া আর মানুষের আহাজারি। কিন্তু নিজের স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি।
উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে কাজ শুরু করেন। হামেদ আশা করেছিলেন, হয়তো তার পরিবারের কেউ জীবিত আছেন। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও কাউকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী ২০ দিন ধরে প্রতিদিন ধ্বংসস্তূপে ফিরে গেছেন তিনি। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ, ছাই আর ইটপাথর সরিয়ে খুঁজেছেন প্রিয়জনদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্ত্রীসহ পরিবারের ১২ সদস্যকেই হারানোর নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে হয়েছে তাকে।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন তার বাবা-মা, দাদা-দাদি, স্ত্রী, চাচা, ফুফা, আত্মীয়স্বজনসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য। হামেদের ভাষায়, জীবনের সবকিছুই তিনি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য করতেন। কিন্তু এখন তার আর এমন কোনো পরিবার নেই, যাদের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখতে পারেন।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারকভাবে তিনি বলেন, তার পরিবারের সদস্যরা ধ্বংসস্তূপের নিচে মাটিচাপা পড়ে আছেন, আর তিনি বাইরে হাঁটছেন মৃত মানুষের মতো। পার্থক্য শুধু একটাই—নিহতদের তালিকায় এখনো তার নাম ওঠেনি। একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কেড়ে নিয়েছে তার স্ত্রী, বাবা-মা, দাদা-দাদিসহ পরিবারের ১২টি প্রাণ। আর বেঁচে থাকা হামেদের কাছে এখন নিজের জীবনটাই যেন চাপা পড়ে আছে সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন