পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে নানা সমস্যা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জেএসএসের মূল অংশ এবং ইউপিডিএফের মূল অংশের মধ্যে এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে সংঘর্ষ, অপহরণ, হত্যা, গুম ও দখল-পাল্টা দখলের ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। অভিযোগ রয়েছে, হাটবাজার, দোকানপাট কিংবা ছোট ব্যবসা পরিচালনা থেকে শুরু করে নির্মাণকাজ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাঁদা দিতে হয়। এমনকি কৃষিপণ্য ও গৃহপালিত পশুপাখি বিক্রির ক্ষেত্রেও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা।
বিশেষ করে রাঙামাটির সাজেক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জেএসএসের মূল অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে জানা গেছে। পর্যটনকেন্দ্র, হোটেল, কটেজ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে সংগঠনটির বিরুদ্ধে। বর্তমানে ইউপিডিএফের মূল অংশ ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে তৎপর হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে গিয়ে সেনাবাহিনীর ২১৭ জন এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ১০৮ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ ও আনসার সদস্যদের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
অন্যদিকে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানির সংকট কমাতে সেনাবাহিনী ও বিজিবির উদ্যোগে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। নিয়মিত চিকিৎসাশিবিরের মাধ্যমে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ১৭৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের বিরোধের কারণে অনেক উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবিকা ও ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্ন রাখার দাবি উঠেছে।
এদিকে পার্বত্য তিন জেলায় ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেও দীর্ঘদিনের জটিলতা রয়েছে। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ভূমি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে হেডম্যানদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, জমি কেনাবেচা ও মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রচলিত কাগজপত্রের যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। ভূমি নিয়ে বিরোধ নিরসনে কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা। পার্বত্য অঞ্চলে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, মুরং, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমী, লুসাইসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ, ভূমি সমস্যার সমাধান এবং সব সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন