টেসলার বহুল আলোচিত বৈদ্যুতিক পিকআপ ট্রাক ‘সাইবারট্রাক’-এর উৎপাদন কমিয়ে আনা কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থিত কারখানায় গাড়িটির উৎপাদন নিয়ে এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক। তবে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হবে, নাকি অন্য কোনো কারখানায় স্থানান্তর করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি। মাস্ক জানিয়েছেন, স্বচালিত গাড়ি ‘সাইবারক্যাব’-এর উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই সাইবারট্রাকের উৎপাদন কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সাইবারট্রাক প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী ওয়েস মরিলের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও গাড়িটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘সাইবারট্রাক ছিল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের অসাধারণ একটি প্ল্যাটফর্ম। সেই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সাইবারক্যাবের মাধ্যমে এগিয়ে যাবে।’
টেসলার অনুরাগীদের মধ্যে গাড়িটি নিয়ে শুরু থেকেই ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও উৎপাদন শুরুর আগে প্রকল্পটি নানা বিলম্বের সম্মুখীন হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে বাজারে আসে সাইবারট্রাক। কিন্তু বাজারে প্রবেশের পর বিক্রির পরিমাণ প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। উৎপাদন বন্ধের সম্ভাবনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করেছেন টেসলার অনেক ভক্ত। এক ব্যবহারকারী সাইবারট্রাককে টেসলার তৈরি সেরা গাড়ি বলে উল্লেখ করে আগামী বছর এর উৎপাদন বন্ধ হওয়ার খবরে দুঃখ প্রকাশ করেন। এর জবাবে মাস্ক ‘সত্য’ লিখে মন্তব্যটির সঙ্গে একমত হন। তবে তিনি জানান, সাইবারট্রাকের গাড়িগুলো দীর্ঘ সময় রাস্তায় চলাচল করবে। সাইবারট্রাক নিয়ে মাস্কের আগ্রহ বরাবরই ছিল উল্লেখযোগ্য। চলতি বছরের মার্চে গাড়িটি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, মানুষের ধারণার চেয়েও এটি অনেক বেশি অসাধারণ। এর আগে এপ্রিল মাসেও তিনি সাইবারট্রাককে টেসলার এখন পর্যন্ত তৈরি সেরা পণ্য হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
তবে মাস্কের এই প্রশংসার সঙ্গে সাধারণ ক্রেতাদের আগ্রহের সামঞ্জস্য কতটা, তা নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা ছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও লাভজনক পিকআপ ট্রাকের বাজারে গাড়িটি কতটা জায়গা করে নিতে পারবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের সংশয় ছিল। ব্যতিক্রমী নকশা ও বিপণন কৌশলের পাশাপাশি গাড়িটির বেশি দাম এবং উৎপাদনসংক্রান্ত জটিলতা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৯ সালে প্রথমবার জনসমক্ষে সাইবারট্রাক উন্মোচনের সময় একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। গাড়ির জানালার কাচের শক্তি প্রদর্শনের জন্য টেসলার এক প্রকৌশলী মঞ্চে ধাতব বল নিক্ষেপ করেন। কাচ অক্ষত থাকার কথা থাকলেও আঘাতে তা ভেঙে যায়। ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং গাড়িটির প্রচারণায় অস্বস্তি তৈরি করে। এরপরও সাইবারট্রাকের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বজায় ছিল। ২০১৯ সালে গাড়িটির উন্নয়নকাজ চলার সময়ই ১ লাখ ৪৬ হাজার অর্ডার পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন ইলন মাস্ক।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৩ সালে বাজারে আসে সাইবারট্রাক। উন্মোচনের সময় দেখানো ব্যতিক্রমী নকশা বজায় রাখে টেসলা। স্টেইনলেস স্টিলের বাইরের কাঠামো এবং ধারালো কোণবিশিষ্ট গড়নের কারণে প্রচলিত পিকআপ ট্রাকগুলোর তুলনায় গাড়িটি ছিল স্বতন্ত্র। নকশাটি টেসলার ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। অনেকেই এর চেহারার সঙ্গে ভবিষ্যৎনির্ভর চলচ্চিত্রের গাড়ির তুলনা করেন। কেউ কেউ জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্র ‘ব্লেড রানার’-এর কোনো যানবাহনের মতো বলেও মন্তব্য করেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা গাড়িটির অস্বাভাবিক নকশা নিয়ে আপত্তি তোলেন। তাঁদের কেউ কেউ এর চেহারাকে কুৎসিত বলেও আখ্যায়িত করেন। নকশা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি বিভিন্ন কারিগরি সমস্যাও সাইবারট্রাকের সুনামকে প্রভাবিত করেছে। একাধিকবার গাড়িটি প্রত্যাহার করতে হয়েছে টেসলাকে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৪৬ হাজারের বেশি সাইবারট্রাক প্রত্যাহার করা হয়। গাড়ির বাইরের ট্রিম বা সাজসজ্জার অংশ খুলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
গাড়িটির উচ্চমূল্যও বাজার সম্প্রসারণের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলোচনায় মাস্ক স্বীকার করেন, সাধারণ ক্রেতাদের কাছে গাড়িটি সহজলভ্য করতে উৎপাদন ব্যয় কমানো প্রয়োজন। তবে সব সুবিধাসহ সাইবারট্রাকের দাম শেষ পর্যন্ত ৬১ হাজার ডলারে পৌঁছায়, যা সে সময় প্রায় ৪৮ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ডের সমান ছিল। ২০২৬ সালে এসে গাড়িটির উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘সাইবারবিস্ট’ সংস্করণের দাম আরও বেড়ে ১ লাখ ২ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে।
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন