রাজনীতি নিষিদ্ধ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরপর দুটি রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মসূচি ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকারিতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে।
গতকাল মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে‘এক শিক্ষার্থী এক কুরআন’ শীর্ষক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান করে ইসলামী ছাত্রশিবির। এর ঠিক আগেই, গত ২১ আগস্ট ইসলামী ছাত্রী সংস্থা আয়োজন করেছিল নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্প। দুটি অনুষ্ঠানই রাজনৈতিক সংগঠনের নামে অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।
‘রাজনীতি নিষিদ্ধ’ ক্যাম্পাসে শিবিরের আয়োজন
মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় শুরু হয় ছাত্রশিবির আয়োজিত কুরআন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী।
আয়োজকদের দাবি, প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে কুরআনের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া ও নৈতিকতা চর্চার প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, যে জাতি কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করে, সেই জাতি কখনও পথভ্রষ্ট হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের কার্যক্রম তরুণ প্রজন্মকে আদর্শ জীবনবোধে উজ্জীবিত করবে।
শিবির নেতারা জানান, তারা ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের আয়োজন করতে চান। তবে শিক্ষার্থীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনীতি নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবির কিভাবে মুক্তমঞ্চ ব্যবহার করল? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া এমন আয়োজন সম্ভব কিভাবে?
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও আশঙ্কা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে এমন অনুষ্ঠান হওয়ায় অনেকে বিস্মিত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের এই ‘চোখ বুজে থাকা’ অবস্থান ভবিষ্যতে বিপজ্জনক নজির সৃষ্টি করবে।
এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘একটি সংগঠন যদি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক ব্যানারে অনুষ্ঠান করতে পারে, তাহলে অন্যরাও চাইবে। এতে নিষেধাজ্ঞার কোনো মানে থাকবে না।’
আরেক শিক্ষার্থী মন্তব্য করেন, রাজনীতি নিষিদ্ধ বলে অন্য সংগঠনগুলো চুপচাপ। কিন্তু কিছু সংগঠন নিয়ম ভেঙে অনুষ্ঠান করছে- এটা স্পষ্ট পক্ষপাত।
ছাত্র সংগঠনগুলোর বক্তব্য
ছাত্র শিবির বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেছি।
সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে কোরআন শরীফ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে ঢাবির ভিপি অংশগ্রহণ করায় ক্যাম্পাসের অনেক শিক্ষক তার সঙ্গে অনুষ্ঠানে সৌজন্য স্বাক্ষত করতে এসছিলেন। তবে শিক্ষকদের কেউ মঞ্চে আসন গ্রহন করেননি। ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ কিন্তু আমরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেছি। ক্যাম্পাসে কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন করেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল নেতা মো. শিহাব মুঠোফোনে বলেন, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ রয়েছে কাগজে-কলমে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কার্যক্রম ক্যাম্পাসেই পরিচালনা করছে। ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, ছাত্র শিবির, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের একাধিক কার্যক্রম করেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সদস্যসচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের নামে গুপ্ত বা অপরাজনীতি চর্চার পক্ষে তিনি নন। তাঁর অভিযোগ, ‘ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের নামে কতিপয় ছাত্রসংগঠনকে প্রশাসন সহযোগিতা করছে।’
সিরাজুলের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নীতিমালার মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতি সক্রিয় রাখার ব্যবস্থা করা উচিত। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে সমাবেশ করেছে। কিন্তু অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠন প্রকাশ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি, কারণ তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পায়নি।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন কোন পথে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবু পরপর দুটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রকাশ্য কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ বলছেন, এসব আয়োজনকে যদি প্রশাসন এখনই নিয়ন্ত্রণে না নেয়, তবে রাজনীতি নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে ফের শুরু হতে পারে সংগঠনভিত্তিক প্রভাব বিস্তার, এমনকি সংঘাতও।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক রাহাত হোসাইন ফয়সাল বলছেন, ‘আমি বিষয়টি জানতাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক ব্যানারে কোনো কার্যক্রম করার অনুমতি নেই। আমরা কোনো সংগঠনকেই অনুমতি দেইনি। আমাদের অনুমতি ছাড়াই যারা কর্মসূচি পালন করেছে, মৌখিকভাবে তাদের সতর্ক করা হবে।’
এর আগে, চলতি বছরের ২১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ভবনের নিচতলায় ইসলামী ছাত্রী সংস্থা আয়োজন করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্প।
উপাচার্য অধ্যাপক তৌফিক আলম তখন বলেছিলেন, কিছু শিক্ষার্থী ফ্রি মেডিক্যাল দিতে চেয়েছিল, তাই মৌখিকভাবে অনুমতি দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা রাজনৈতিক ব্যানারে করবে, সেটা জানতাম না।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন