স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে মতপার্থক্য তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে এসব মতভেদ সহজেই দূর করা সম্ভব। বিপরীতে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে বারবার বিরোধ তৈরি হলে তা ধীরে ধীরে বড় অশান্তিতে রূপ নিতে পারে। এমনকি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। সুখী ও স্থায়ী দাম্পত্য জীবন গড়তে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, জীবনসঙ্গীর কাছে নিখুঁত আচরণ প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। পৃথিবীর কোনো মানুষই সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়। তাই সঙ্গীর কিছু ভুলত্রুটি বা অপছন্দনীয় স্বভাব থাকতেই পারে। ভালো দিকগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে এসব বিষয় গ্রহণ করার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে সম্পূর্ণ অপছন্দ না করে; তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য কোনো স্বভাব অবশ্যই পছন্দনীয় হবে। সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৬৯।
দ্বিতীয়ত, সঙ্গীকে নিজের কল্পিত ছাঁচে পরিবর্তন করার চেষ্টা করা উচিত নয়। ভিন্ন পরিবার ও পরিবেশে বেড়ে ওঠা দুজন মানুষের চিন্তা, অভ্যাস ও মূল্যবোধে পার্থক্য থাকবেই। তাই জোর করে পরিবর্তন করার বদলে ধীরে ধীরে বোঝাপড়া তৈরি করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৩১।
তৃতীয়ত, সঙ্গীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে। অসুস্থতা, গর্ভাবস্থা, সন্তান লালন-পালনের চাপ কিংবা পারিবারিক দুশ্চিন্তার সময় একজন মানুষের মানসিক অবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে। এসব সময়ে অভিযোগের পরিবর্তে সহানুভূতি ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
চতুর্থত, রাগের সময় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। উত্তেজনার মুহূর্তে বলা কথা কিংবা নেওয়া সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে বড় অনুশোচনার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে বিচ্ছেদ বা তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি শান্ত করা জরুরি।
পঞ্চমত, একে অপরের ব্যক্তিগত পরিসর ও গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। দাম্পত্য সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে দুজনের প্রত্যেকটি ব্যক্তিগত বিষয় জোর করে জানতে হবে। অযথা সন্দেহ কিংবা ব্যক্তিগত বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে পারে।
ষষ্ঠত, নতুন দাম্পত্য জীবনে ধৈর্য ধরতে হবে। বিয়ের পর দুজনের অভ্যাস ও জীবনযাপনের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি হতে সময় লাগে। ছোটখাটো ভুলকে বড় করে না দেখে সময়ের সঙ্গে একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
সপ্তমত, স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত সমস্যা অযথা তৃতীয় ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করা উচিত নয়। ছোটখাটো বিরোধ বাইরে ছড়িয়ে পড়লে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে উভয় পরিবারের বিচক্ষণ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। সূত্র: পবিত্র কোরআন, সুরা নিসা, আয়াত ৩৪-৩৫।
অষ্টমত, দাম্পত্য জীবনে ধৈর্যের চর্চা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সব মতপার্থক্য তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান হবে না। অনেক সময় ভালোবাসা, ক্ষমা ও ধৈর্যই সম্পর্ককে সংকট থেকে বের করে আনে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, মন্দকে উত্তম আচরণের মাধ্যমে প্রতিহত করতে; এতে শত্রুতাও বন্ধুত্বে পরিণত হতে পারে। সূত্র: পবিত্র কোরআন, সুরা ফুসসিলাত, আয়াত ৩৪-৩৫।
সব মিলিয়ে, সুখী সংসারের জন্য শুধু ভালোবাসা নয়—প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা, ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কঠিন সময়ে একে অপরের পাশে থাকার মানসিকতা। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেটিকে কীভাবে সামলানো হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত একটি দাম্পত্য সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন