সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু। দেশের ৬৪ জেলাতেই রোগী শনাক্ত হওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। জুন ও জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৫ হাজার ৬০১ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭৫৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন আরও তিনজন।
চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। মোট আক্রান্তের ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী। তবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। ডেঙ্গুতে মৃতদের ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ নারী এবং ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ঢাকা বিভাগে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনসহ এ বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ২৩৫ জন। এরপর সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগে ৪ হাজার ৫৫৯ জন, চট্টগ্রামে ৪ হাজার ১০৬ জন, খুলনায় ৩ হাজার ৪৬৬ জন, ময়মনসিংহে ১ হাজার ২২৩ জন, রাজশাহীতে ১ হাজার ১৭১ জন, রংপুরে ৭০৫ জন এবং সিলেটে ১৩৬ জন।
জেলাভিত্তিক হিসাবেও কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। খুলনায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫৪২ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ১৩ জন। পিরোজপুরে আক্রান্ত ১ হাজার ২১০ জন, মৃত্যু হয়েছে একজনের। বান্দরবানে ৪৪৮ জন আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন দুজন। ঢাকা জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৭৫৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৩৩ জনের। ময়মনসিংহে আক্রান্ত ৮৯৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণেও দেশের কয়েকটি জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গু সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঝালকাঠি, খুলনা, পিরোজপুর, বান্দরবান, ঢাকা ও ময়মনসিংহকে বাড়তি সংক্রমণের তালিকায় রাখা হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাবেও ডেঙ্গুর ভয়াবহতা স্পষ্ট। মে মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৭১৪ জন। জুনে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০৭ জনে। জুলাইয়ে তা আরও বেড়ে হয় ৯ হাজার ২০৬ জন। আর আগস্টের প্রথম ১৮ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ২৯১ জন।
মৃত্যুর দিক থেকেও জুলাই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই মাসে ডেঙ্গুতে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগস্টের প্রথম ১৮ দিনেই মারা গেছেন ২০ জন। জুনে ১৩ জন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুইজন করে মারা যান। মে মাসে একজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই দেশব্যাপী এডিস মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নেই; দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাই সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে একযোগে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, বৃষ্টির পানি জমে থাকা বিভিন্ন পাত্র, ড্রাম, মটকা ও চৌবাচ্চার পানি নিয়মিত ফেলে দিতে হবে। পাত্রগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করে রাখতে হবে এবং যেসব স্থানে পানি জমে থাকে, সেগুলো দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা হালনাগাদ, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ এবং হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও তরল সরবরাহ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর দ্রুত ও সঠিক রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো রোগ শনাক্ত না হলে রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। সেপ্টেম্বর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে উল্লেখ করে তিনি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সব মিলিয়ে, ৬৪ জেলায় ডেঙ্গুর বিস্তার এবং আগস্টে আক্রান্তের দ্রুত বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে নতুন করে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। তাই রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি ডেঙ্গুর মূল বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন