জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন তীব্র হলেও তা মোকাবিলায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও সেবার সুযোগ এখনো সীমিত। ঋণ, কৃষি পরামর্শ, বিমা, প্রযুক্তি ও জলবায়ু তথ্যের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় প্রকৃতি পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে তাদের জন্য। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকদের জলবায়ু অভিযোজনের এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ১০১টি সমবায়ের মাধ্যমে এক লাখ ৩৩ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র কৃষক সেবা পাচ্ছেন। বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও নেপাল—এই তিন দেশে ৪৯০টি সমবায়ের মাধ্যমে তিন লাখ ৫১ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র কৃষককে সেবার আওতায় আনা হয়েছে। এসব সমবায়ের সদস্যদের ৯৫ শতাংশের বেশি নারী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, আকস্মিক বন্যা ও মাটির অবক্ষয়ের মতো নানা ঝুঁকির মুখে রয়েছেন ক্ষুদ্র কৃষকেরা। এর সঙ্গে খণ্ডিত জমি, অর্থের সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং ঋণ ও বিমায় সীমিত প্রবেশাধিকার তাদের পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অর্থায়নের ১০ শতাংশেরও কম স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা কৃষকদের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ ও সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শারমিন নিলোর্মি মনে করেন, তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে কৃষিতে ব্যয় ও অভিযোজনের চাপ বাড়ছে। তার মতে, কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন ও কৃষিঋণের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় কৃষক সংগঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অর্থায়নকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক এলাকায় পুরুষেরা কৃষিকাজ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় নারীদের ওপর কৃষির দায়িত্বও বাড়ছে। কিন্তু দায়িত্ব বাড়লেও জমির মালিকানা, ঋণ, কৃষি পরামর্শ ও জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা এখনো সমান সুযোগ পাচ্ছেন না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচলিত কৃষি সম্প্রসারণসেবার মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ কার্যকরভাবে নারীদের কাছে পৌঁছায়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পনির্ভর পরিকল্পনাও দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনের পথে বাধা তৈরি করছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় নারী নেতৃত্বাধীন সমবায়গুলোকে একটি কার্যকর সংযোগমাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব সমবায়ের মাধ্যমে কৃষকদের অর্থায়ন, প্রযুক্তি, বাজার, কৃষি তথ্য ও বিমার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ১৪টি সৌরচালিত সেচপাম্প স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের অংশগ্রহণে প্রায় ২০০ ডলার ব্যয়ে ইন্টারনেট ও সেন্সরনির্ভর স্বয়ংক্রিয় সূক্ষ্ম জলকণা ছড়ানোর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। দুই শতাধিক কৃষক পরিবারে আবহাওয়াসহিষ্ণু ছাদও স্থাপন করা হয়েছে। কৃষি ও পশুপালনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিমার ক্ষেত্রেও সমবায়কে কাজে লাগানো হচ্ছে। ১৫০-এর বেশি কৃষক পশুসম্পদ বিমার আওতায় এসেছেন। এছাড়া ৭০ জনকে ব্যাংকিং সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩০ জন সক্রিয়ভাবে কৃষকদের ঋণের আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করছেন।
যশোরে মাটির স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে ৬৬ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা কৃষকদের মাটির নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে পাঠানো এবং সার ব্যবহারের সুপারিশ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করছেন। তবে স্থানীয় পর্যায়ে সফল উদ্যোগ তৈরি হলেও সেগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ও বৃহৎ পরিসরের ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া এখনো কঠিন। স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প, সীমিত কার্যক্রম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্বল সমন্বয়ের কারণে অনেক উদ্যোগ প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও টেকসইভাবে চালু রাখা সম্ভব হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষকদের মানিয়ে নিতে শুধু প্রকল্পভিত্তিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, সহজ ঋণ, কৃষি পরামর্শ, বিমা, প্রযুক্তি এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন