রংপুরের মাটিতে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ থেকে সরকারকে ঘিরে একের পর এক কঠোর অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় এলেও জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। একই সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, গণভোটের রায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দেশের বিভিন্ন সংকট নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন তিনি। শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ৮ দফা দাবিতে ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। সমাবেশটি ছিল ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচির শেষ পর্ব। তাদের ঘোষিত ৮ দফার মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-গ্যাস-তেল ও সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল জাতীয় স্বার্থ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রসঙ্গ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না এবং দিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা করে এ বিষয়ে অগ্রগতি কেন হচ্ছে না। ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রেও সরকার ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে এগুলো নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ; এর সত্যতা বা সরকারের অবস্থান আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগও তোলেন এনসিপির এই নেতা। একই সঙ্গে শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। সাম্প্রতিক একটি মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর বক্তব্য, দেশের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রায় এলেও দেশে অবস্থানরত অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে কেন একই ধরনের রায় আসছে না—এমন প্রশ্নের জবাব চান তিনি।
দেশের অর্থনৈতিক ও জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যার কথাও তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর বক্তব্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট বিশেষভাবে উঠে আসে। রংপুর অঞ্চলের মানুষের জীবিকার সঙ্গে কৃষি সরাসরি জড়িত উল্লেখ করে তিনি কৃষকদের প্রয়োজনীয় উপকরণ পাওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন। পাশাপাশি সরকারি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং সন্ত্রাসের অভিযোগও করেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিশু ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। পাশাপাশি ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হলে পাল্টা প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত থাকার কথাও বলেন নাহিদ ইসলাম।
পুলিশ সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রসঙ্গেও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, পুলিশ সংস্কার কমিশন করা হয়নি এবং বিরোধী দল দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে এবং কেউ কর্তৃত্ববাদী হওয়ার চেষ্টা করলে রংপুর থেকেই প্রতিরোধের আহ্বান আসবে। এদিকে রংপুরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি ক্ষমাও চান নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দলকে ভোট দেওয়ার কারণে রংপুর উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হতে পারে—এমন কথা শুনতে হচ্ছে স্থানীয় মানুষকে। এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে রংপুরের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নকে ১১ দলীয় ঐক্যের ৮ দফার অন্যতম দাবি হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
শেষদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের ৮ দফা দাবি আদায়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম। তাঁর বক্তব্য, ২০২৪ সালের মতো ঐক্য ধরে রাখতে পারলে ৮ দফা দাবি আদায় করেই ঘরে ফেরার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। রংপুরের এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শেষ হলেও সামনে তাদের দাবিগুলো নিয়ে কী ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, গণভোটের রায়, আইনশৃঙ্খলা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস-সার সংকট—এই বিষয়গুলোই আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন