দীর্ঘদিনের চেষ্টা, বিপুল অর্থ ব্যয়, আর বুকভরা স্বপ্ন—সবকিছু ঠিক থাকার পরও শেষ মুহূর্তে বিদেশযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে বহু বাংলাদেশির। কেউ ছুটিতে দেশে এসে আর ফিরতে পারছেন না সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিজের কর্মস্থলে, আবার কেউ ইউরোপের কোম্পানি থেকে কাজের অনুমতিপত্র পেয়েও ভারতের ভিসা না পাওয়ায় আটকে আছেন। শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা পিছিয়ে যাচ্ছে। একদিকে চাকরি হারানোর আশঙ্কা, অন্যদিকে সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়—সব মিলিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন এখন অনেকের কাছে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে নিম্নমুখী প্রবণতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মান্থলি ইকোনমিক ট্রেন্ডস, সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন ৭১ হাজার ৮৪ জন কর্মী। আগস্টে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৯২৯ জনে। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসেই বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা কমেছে ৭৬ হাজার ৯৪৬ জন, যা ৩৬ দশমিক ৪৭ শতাংশের সমান।
এর আগেও বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে পতন দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে বিদেশে গিয়েছিলেন ১ লাখ ৬০ হাজার ২৮৩ জন কর্মী। অথচ তার আগের প্রান্তিকে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫ হাজার ৩৮৪। আগের বছরের একই সময়ে বিদেশে গিয়েছিলেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭১৯ জন। ধারাবাহিক এই পতন দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে প্রবাসী আয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৫৮২ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি। শুধু আগস্ট মাসেই প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার। কিন্তু নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার সংখ্যা কমতে থাকলে ভবিষ্যতে প্রবাসী আয়ের এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ, বর্তমানে দেশে আসা প্রবাসী আয়ের বড় অংশই আসছে আগে থেকে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের কাছ থেকে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হলে দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের অর্থনীতিতেও।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে এই সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সংঘাত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একাংশের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। প্রবাসীদের অভিযোগ, দেশটিতে প্রায় সাড়ে চার হাজার বাংলাদেশির ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। তাঁদের অনেকে ছুটিতে দেশে এসে ভিসা বাতিলের কারণে আর কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। এতে চাকরি, আয় এবং পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তাঁরা।
চার মাস আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফিরেছিলেন সাইফুল ইসলাম। সেখানে একটি কোম্পানিতে সুপারভাইজার হিসেবে ভালো বেতনে চাকরি করতেন তিনি। নিজের গাড়িও ছিল তাঁর। কিন্তু হঠাৎ জানতে পারেন, অনেকের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। নিজের ভিসার অবস্থা যাচাই করতে গিয়ে দেখেন, তাঁর ভিসাও বাতিল হয়ে গেছে।
নিজের দুরবস্থার কথা জানিয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, সবকিছু তাঁর কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে। ভালো বেতনের চাকরি ও নিজের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ ভিসা বাতিলের ঘটনায় তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। দেশে ফেরার পর টিকিটের টাকাও লোকসান হয়েছে। এখন জমানো টাকা দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন, কিন্তু সেই সঞ্চয়ও প্রায় শেষের দিকে।
শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপে পড়াশোনা ও চাকরির সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশিদেরও নতুন বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও কনস্যুলার কার্যক্রমের একটি অংশ ভারতের দিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে পরিচালিত হয়। ফলে কিছু আবেদনকারীকে সাক্ষাৎকার দেওয়া কিংবা পাসপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য ভারতে যেতে হয়। কিন্তু ভারতের ভিসা না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী ও কাজের অনুমতিপত্র পাওয়া কর্মী নির্ধারিত সময়ে সেখানে যেতে পারছেন না। ফলে আটকে যাচ্ছে তাঁদের ভিসা প্রক্রিয়া, পিছিয়ে যাচ্ছে বিদেশযাত্রার পরিকল্পনা।
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিদেশে যেতে হবে—এমন আবেদনকারীরা। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, শিক্ষাবর্ষ শুরু এবং আবাসন নিশ্চিত করার সময়সীমা থাকে। অন্যদিকে, চাকরিপ্রার্থীদের নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। সময়মতো দূতাবাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারলে ভর্তি বা চাকরির সুযোগ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ভিসা আবেদন, কাগজপত্র প্রস্তুত, নিয়োগপ্রক্রিয়া ও যাতায়াতের পেছনে ব্যয় করা অর্থও অনিশ্চয়তায় পড়ে যাচ্ছে।
এরই মধ্যে এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন শাফিন আহমেদ। রোমানিয়ার একটি কোম্পানি থেকে প্রায় দেড় মাস আগে কাজের অনুমতিপত্র পেলেও ভারতের ভিসা না পাওয়ায় তিনি দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা দিতে পারছেন না। গত দুই বছর ধরে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করার পর অবশেষে কাজের অনুমতিপত্র পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ ধাপে এসে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
শাফিন আহমেদ জানান, ১২ অক্টোবর রোমানিয়ার দূতাবাসে তাঁর সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ভারতের ভিসা না পাওয়ায় সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারছেন না তিনি। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, মনে হচ্ছে, জীবনের স্বপ্নটা এখানেই থেমে যাচ্ছে।সব মিলিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও নানা প্রশাসনিক জটিলতা, ভিসাসংক্রান্ত বাধা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন না অনেক বাংলাদেশি। বিদেশে যাওয়ার জন্য অর্থ ব্যয় ও দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও শেষ মুহূর্তে আটকে যাওয়ায় তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের প্রবাসী আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন