ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক তৎপরতা যখন নতুন মোড় নিচ্ছে, তখনই যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিল তেহরান—চাপ বা হুমকির মুখে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করবে না ইরান, এমনকি নিজেদের ইউরেনিয়ামের মজুতও হস্তান্তর করবে না। অন্যদিকে, যুদ্ধ থামাতে ‘সাধ্যমতো সবকিছু’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আর পুতিনের সহায়তার প্রস্তাবের মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও জানালেন, যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সংলাপের পথ খোলা রাখতে প্রস্তুত তাঁর দেশ। তাহলে কি যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই নতুন কোনো সমঝোতার পথ তৈরি হচ্ছে?
ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামী বৃহস্পতিবার বলেছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা এবং তা মজুত রাখা ইরানের বৈধ অধিকার। তাঁর বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অপরিহার্য। ইরান দাবি করছে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির আওতায় থেকেই তারা এই কার্যক্রম চালাচ্ছে। মোহাম্মদ ইসলামী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় আবারও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম থেকে এই প্রক্রিয়াকে আলাদা করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের জাতীয় উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় পারমাণবিক প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেয় উল্লেখ করে তিনি ইরানের কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন দাবির সমালোচনা করেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে কিংবা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে দেওয়া হবে না। যুদ্ধের সময় ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়েছে। তবে তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা নেই।
এদিকে, যুদ্ধ বন্ধে ইরানকে সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বৃহস্পতিবার মধ্য এশিয়ার দেশ তুর্কমেনিস্তানে কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটসের সম্মেলন উপলক্ষে গিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি। সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে পুতিন বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ইরানের জন্য রাশিয়ার সাধ্যের মধ্যে যা কিছু করা সম্ভব, মস্কো তা করতে প্রস্তুত। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকেই ইরান যুদ্ধ অবসানের জন্য প্রকৃত প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। একই সঙ্গে ইরান ও রাশিয়ার সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে মস্কো ও তেহরানের কূটনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমীকরণে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, তিনি জানিয়েছেন, সংঘাতের অবসানে আলোচনার প্রচেষ্টা থেকে তেহরান সরে দাঁড়াবে না। পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান সংলাপে যুক্ত রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সময়ই নতুন করে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তারপরও আলোচনার টেবিল ছেড়ে না যাওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা যখন অচলাবস্থার মুখে, তখন পুতিনের সঙ্গে পেজেশকিয়ানের এই বৈঠক নতুন কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান কতটা বদলাবে, রাশিয়ার উদ্যোগে যুদ্ধ বন্ধের কোনো কার্যকর পথ তৈরি হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। আপাতত ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে, আর যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নির্ভর করছে পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন