ঢাকার অভিজাত ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে একটি শিশুকে প্লে-গ্রুপে ভর্তি করাতেই খরচ হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। কোথাও ভর্তি ফি এক লাখ টাকা, কোথাও এক লাখ ১৫ হাজার। আবার এমন স্কুলও রয়েছে, যেখানে শুধু ভর্তি ফি প্রায় ১১ লাখ টাকা! এর সঙ্গে রয়েছে প্রতি মাসের মোটা অঙ্কের বেতন, বই-খাতা, পোশাক এবং কোচিংয়ের খরচ। অথচ এত ব্যয়বহুল হওয়ার পরও ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থী কমলেও ইংরেজি মাধ্যমের প্রতি আগ্রহ কেন বাড়ছে?
ঢাকার ধানমন্ডি, গুলশান ও উত্তরার বিভিন্ন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও মাসিক বেতনের পরিমাণ পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে। সানিডেল স্কুলে প্লে-গ্রুপে ভর্তির জন্য দিতে হয় এক লাখ ১৫ হাজার টাকা, আর মাসিক বেতন ২০ হাজার টাকা। মাস্টারমাইন্ড স্কুলে প্লে-গ্রুপের ভর্তি ফি এক লাখ টাকা এবং মাসিক বেতন ১৪ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকায় ভর্তি ফি প্রায় ৯ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১ লাখ টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার টিউশন ফি।
শুধু ভর্তি ও মাসিক বেতনেই খরচ শেষ নয়। প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বই, ইউনিফর্ম, খাতা-কলমসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ কিনতে হয়। কোনো কোনো স্কুলে নির্দিষ্ট দোকান থেকে এসব পণ্য কেনার ব্যবস্থাও রয়েছে। একজন অভিভাবকের ভাষ্য অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর জন্য ৫৬টি খাতা, ১৮টি বই, কলম, পেনসিল এমনকি টিস্যু বক্সও কিনে স্কুলে জমা দিতে হয়েছে। এর বাইরে অনেক শিক্ষার্থীকে কোচিং সেন্টারে পড়তে হয়, যা পরিবারের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, গত পাঁচ বছরে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে ভর্তি ও টিউশন ফি প্রায় ২১ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অথচ এসব স্কুলের ফি নির্ধারণ ও কার্যক্রম তদারকির জন্য কার্যকর নীতিমালা এবং অভিযোগ জানানোর নির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় অভিভাবকদের ভোগান্তি বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে উচ্চ ব্যয়ের পরও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষার্থী ছিল ৬৮ হাজার ৮২৫ জন। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৭১ হাজার ৪৫৬ জন। ২০২৩ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৭২ হাজার ৭৩৯, ২০২৪ সালে ৭৬ হাজার ৪২ এবং ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৯ হাজার ৫৮৯ জনে। অর্থাৎ, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শিক্ষার্থী বেড়েছে ১০ হাজার ৭৬৪ জন। অন্যদিকে, সাধারণ শিক্ষায় দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থী ছিল প্রায় এক কোটি ৯৬ লাখ ৭৪ হাজার। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজারে। এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে ৯ লাখ ৪২ হাজারের বেশি। শুধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখেরও বেশি। এই বিপরীতমুখী প্রবণতা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের মতে, ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন, দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং চাকরির বাজারে বাড়তি সুবিধার আশায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে আগ্রহী হচ্ছেন। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগ, পাঠদানের পদ্ধতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধাও পরিবারগুলোকে আকৃষ্ট করছে। সাধারণ শিক্ষার পাঠ্যক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগও বিকল্প ধারার প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতেও রয়েছে বড় পার্থক্য। সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষায় গড়ে প্রতি ৫২ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। অথচ ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে এই অনুপাত গড়ে একজন শিক্ষকের বিপরীতে ১০ জন শিক্ষার্থী। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকার কথা। ফলে শ্রেণিকক্ষে ব্যক্তিগত মনোযোগ পাওয়ার সুযোগ ইংরেজি মাধ্যমের প্রতি আকর্ষণের অন্যতম কারণ হতে পারে।
তবে সাধারণ শিক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ শুধু শিক্ষকসংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি পড়ানো প্রায় ১০ হাজার শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয় ছিল না। একইভাবে গণিত পড়ানো ১০ হাজারের বেশি শিক্ষকের স্নাতকে গণিত ছিল না। এ ছাড়া মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের প্রয়োজনীয় পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই। এদিকে, দেশের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর বিস্তারও মূলত শহরকেন্দ্রিক। ২০২৫ সালে দেশে এ ধরনের স্কুলের সংখ্যা ছিল ১৪৩টি, যার মধ্যে ১৪১টিই সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত। অর্থাৎ, প্রায় ৯৯ শতাংশ ইংরেজি মাধ্যম স্কুল শহরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।
অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষায়ও শিক্ষার্থী বেড়েছে। ২০২৪ সালে দাখিল থেকে কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ২৭ লাখ ৯৬ হাজার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি হয়েছে। এক বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারেরও বেশি। সব মিলিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একদিকে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমছে, অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বাড়ছে। ইংরেজি মাধ্যমের উচ্চ ব্যয় সত্ত্বেও এই প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, অভিভাবকেরা সন্তানের ভবিষ্যৎ, ভাষাগত দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—উচ্চ ফি দিয়ে পড়ালেই কি নিশ্চিত হবে মানসম্মত শিক্ষা, নাকি প্রয়োজন হবে সব ধারার শিক্ষায় গুণগত মান, জবাবদিহি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা?
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন