একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান দিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন একদল শিক্ষার্থী। প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তাঁরা মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর কুশপুত্তলিকাও দাহ করেন। শিক্ষার্থীদের দাবি, একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়েও বাধা সৃষ্টি হওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক, আর এর পেছনে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করা জরুরি।
সোমবার, ২৬ অক্টোবর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় এই বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করতে না পারার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা। কর্মসূচিতে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু রায়হান কবির রাসেল। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থি রাজনৈতিক চিন্তা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও একজন মুক্তিযোদ্ধাকে গোপনে গার্ড অব অনার দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজাকারদের ছবি প্রদর্শনের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে রাসেল বলেন, আগে তাঁরা ভেবেছিলেন, নির্বাচিত সরকার না থাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত না হওয়ার অভিযোগ তাঁদের হতাশ করেছে। তিনি এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান। সমাবেশে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক সোহাগী সামিয়াও গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণেই মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সোহাগী সামিয়া বলেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে যাঁরা বাধা দিয়েছেন, তাঁদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রবণতার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একজন মুসলমানের ধর্মীয় রীতিতে দাফন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টির অভিযোগকে তিনি অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। সোহাগী সামিয়া বলেন, যাঁরা ২০২৪ সালের চেতনার কথা বলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উপেক্ষা করতে চান, তাঁদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ না করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকেও যথাযথভাবে ধারণ করা সম্ভব নয়।
সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, জনগণের সরকার হলে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা সমুন্নত রাখার পাশাপাশি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতো। সব মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টির অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্ন। তবে দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য জানা গুরুত্বপূর্ণ।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন