মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব এবার বিশ্ববাজারে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, ধাতু থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুদ্ধ ও পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে সামগ্রিক পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে খাদ্যসংকট ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে বহু দেশে।
ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পণ্যবাজারবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জাহাজ চলাচলে বাধা এবং তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসের মতে, আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার একসঙ্গে একাধিক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর এটিই হবে জ্বালানির দামের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। তেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল ৯২ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বাজারদর ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তেলের চাহিদা এ বছর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় এবং ১৯৮০ সালের তেলসংকটের পর এটি হতে পারে চাহিদা কমার অন্যতম বড় ঘটনা। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন হতে পারে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে খাদ্যবাজার নিয়ে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাতের কারণে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে। এর ফলে ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। পরের বছরও দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়া, শস্য সরবরাহে বাধা, তেল অবকাঠামোর ক্ষতি এবং শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব একসঙ্গে দেখা দিলে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের চেয়ে আরও ১২ শতাংশ বেশি বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকট তীব্র হওয়ার পাশাপাশি আরও বহু মানুষ চরম দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
কৃষি উৎপাদনের খরচও বাড়তে পারে। ইউরিয়ার দাম বৃদ্ধির প্রভাবে ২০২৬ সালে সারের দাম ১৪ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। শিল্প খাতেও বাড়ছে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামোয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। সামগ্রিকভাবে ২০২৬ সালে ধাতব পণ্যের দাম ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এদিকে, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর চাহিদাও বেড়েছে। ফলে চলতি বছরে এসব ধাতুর দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, খাদ্য, কৃষি, শিল্প ও বিনিয়োগের বাজারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। পরের বছর কিছু পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনা থাকলেও আবহাওয়াজনিত বিপর্যয় ও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেই স্বস্তি নষ্ট হতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন