বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক এখন শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগ কিংবা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ নানা ক্ষেত্রে বাড়ছে দুই দেশের সহযোগিতা। আর এই সম্পর্ককে আরও গভীর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে চীনা ভাষা শিক্ষা। বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য চীনা ভাষা জানা খুলে দিতে পারে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক পেশাগত জীবনের নতুন সম্ভাবনা।
১৯৮৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর চীনা ভাষা শেখার উদ্দেশ্যে বেইজিংয়ে পাড়ি জমান এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। ভর্তি হন তৎকালীন বেইজিং ভাষা ইনস্টিটিউটে, যা বর্তমানে বেইজিং ভাষা ও সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত। তখন তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ভাষা শেখা এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। কিন্তু সেই শিক্ষা পরবর্তী সময়ে তাঁকে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ককে নতুনভাবে বোঝার সুযোগ করে দেয়।
প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে চীনা ভাষা শিক্ষার প্রতি আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতা যত বাড়ছে, ততই চীনা ভাষায় দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীদের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, প্রথমবার চীন যাওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে দেশটির দুই শতাধিক শহর ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের হারবিন থেকে দক্ষিণের হাইনান পর্যন্ত ঘুরে তিনি চীনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন কাছ থেকে দেখেছেন। পাশাপাশি চীনা মানুষের আন্তরিকতা এবং বাংলাদেশের প্রতি তাঁদের আগ্রহও তাঁকে মুগ্ধ করেছে। চীনা ভাষাজ্ঞান তাঁর পেশাগত জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০১ ও ২০০২ সালে বাংলাদেশ ও চীনের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলগুলোর বৈঠকে দোভাষী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। তাঁর মতে, দোভাষীর কাজ শুধু এক ভাষার কথা অন্য ভাষায় তুলে ধরা নয়; বরং দুই দেশের মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া, আস্থা ও সম্পর্ক তৈরি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০০৮ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে চীনা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। শ্রেণিকক্ষ, অনলাইন শিক্ষা ও বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে হাজারো শিক্ষার্থীকে ভাষাটি শেখানোর অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। তাঁদের অনেকেই বর্তমানে দোভাষী, অনুবাদক, প্রকৌশলী, গবেষক, নাবিক, ব্যবস্থাপক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। কেউ পেয়েছেন চীনে উচ্চশিক্ষার বৃত্তি, আবার কেউ ভাষাজ্ঞানের কারণে পেয়েছেন ভালো চাকরির সুযোগ। তবে বাংলাদেশে চীনা ভাষা শেখার আগ্রহ বাড়লেও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ এখনো চাহিদার তুলনায় কম। তাই বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র ও পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে চীনা ভাষা শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
তাঁর মতে, ভাষা শেখা শুধু ব্যক্তিগত কর্মজীবনের উন্নতি ঘটায় না, বরং দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ায়, ভুল ধারণা কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বের ভিত্তি শক্তিশালী করে। বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, তখন চীনা ভাষা শিক্ষায় বিনিয়োগ হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ একটি ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন দরজাও খুলে দিতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন