ঢাকা | |
সংবাদ শিরোনাম :
মালয়েশিয়াগামী বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য অনুমোদিত ৫১ মেডিকেল সেন্টারের তালিকা প্রকাশ টেকনাফে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে সেনাসদস্য নিহত, উদ্ধার ৫৭ জিম্মি নাজিব রাজাকের জরিমানার অর্থ পরিশোধ করল ইউএমএনও, গৃহবন্দির পথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শীতের সবজিতে বাজারে কিছুটা স্বস্তি, চড়া দাম মুরগি-মাছ ও মাংসে অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে আজিমপুর সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ব্যবসায়ীদের বাড়তি ব্যয় না থাকলে শ্রমিকদের ৩০-৪০ হাজার টাকা বেতন দেওয়া সম্ভব হতো: মাসুদুজ্জামান উত্তরায় চীনা নাগরিকদের মাসের পর মাস লাইভ ভিডিও, গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের সচিবের সঙ্গে পুতিনের বৈঠক কুবি শিক্ষার্থীদের তল্লাশি, পুলিশ পরিচয় দেওয়া তিনজনকে ক্যাম্পাসে নিয়ে গেলেন শিক্ষার্থীরা তাহসিফ হত্যা মামলায় দীপকে তৃতীয় দফায় রিমান্ডে নিতে চায় পুলিশ

উত্তরায় চীনা নাগরিকদের মাসের পর মাস লাইভ ভিডিও, গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা

ঢাকার উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় মাসের পর মাস ধরে লাইভ ভিডিও ধারণ করছেন একদল চীনা নাগরিক। সকাল থেকে রাত
  • আপলোড সময় : ৬ নভেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:৪১ সময়
  • আপডেট সময় : ৬ নভেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:৪১ সময়
উত্তরায় চীনা নাগরিকদের মাসের পর মাস লাইভ ভিডিও, গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা
ঢাকার উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় মাসের পর মাস ধরে লাইভ ভিডিও ধারণ করছেন একদল চীনা নাগরিক। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাস্তাঘাট, দোকানপাট ও আবাসিক এলাকায় ঘুরে তাঁরা ভিডিও করেন। অনেকের হাতে থাকে দুটি মুঠোফোন—একটি দিয়ে সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার করেন, অন্যটিতে বিভিন্ন তথ্য দেখেন বা লেখেন। তাঁদের এমন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কৌতূহলের পাশাপাশি বিরক্তিও বাড়ছে। বিশেষ করে অনুমতি ছাড়া বাড়িঘরে প্রবেশ করে ভিডিও ধারণের অভিযোগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর ও টেকপাড়া এলাকায় গেলে চীনা নাগরিকদের এমন ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়। সেখানে ঠিক কতজন চীনা নাগরিক এভাবে ভিডিও করছেন, তার নির্দিষ্ট কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দেড় শতাধিক চীনা নাগরিক এলাকার বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরে ভিডিও ধারণ করেন। এসব ভিডিও কোথায় প্রচার করা হয় কিংবা সেখানে কী ধরনের বক্তব্য দেওয়া হয়, তা সম্পর্কে স্থানীয়দের স্পষ্ট ধারণা নেই। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এমন কর্মকাণ্ড চললেও বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান নজরদারি নেই। শুরুতে বিষয়টি কৌতূহল তৈরি করলেও এখন অনেক বাসিন্দাই এতে বিরক্ত।

টেকপাড়ার বাসিন্দা আকরাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এক-দুই দিনের বিষয় হলে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু চীনা নাগরিকেরা মাসের পর মাস একইভাবে ভিডিও করছেন। বাসিন্দারা ঘুম থেকে ওঠার আগেই তাঁদের ভিডিও শুরু হয়, আবার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও তাঁদের ভিডিও করতে দেখা যায়। তবে এসব ভিডিও কী কাজে ব্যবহার করা হয়, তা তাঁরা জানেন না।

ভিডিওগুলো কোথায় প্রকাশ করা হয়
উত্তরায় চীনা নাগরিকদের এমন কর্মকাণ্ড স্থানীয়দের পাশাপাশি নতুন আসা মানুষের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি করছে। অনেকেই জানতে চান, কেন তাঁরা দিনের পর দিন এভাবে ভিডিও ধারণ করছেন। বিশেষ করে এলাকাটিতে উল্লেখযোগ্য পর্যটন আকর্ষণ না থাকলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কেন এত বেশি ভিডিও করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় এমন ভিডিও ধারণ করা হলেও সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা যায় টেকপাড়ায়। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের পাশের একটি খালের তীরে অবস্থিত এলাকাটি। উত্তরার অন্যান্য অংশের তুলনায় এখানে নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এলাকাটির পরিবেশও তুলনামূলক অপরিচ্ছন্ন। চীনা নাগরিকেরা বিশেষভাবে এই এলাকাটিকেই ভিডিও ধারণের জন্য বেছে নিয়েছেন বলে জানান স্থানীয়রা।

গত ২৭ অক্টোবর ও ৩ নভেম্বর উত্তরার এসব এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ১৭ জন চীনা নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে প্রথম আলো। তাঁদের ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য ও প্রচারের মাধ্যম সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তবে অধিকাংশ চীনা নাগরিক কথা বলতে আগ্রহ দেখাননি। কয়েকজন শুধু নিজেদের নাম ও দেশের পরিচয় দিয়ে চলে যান। কেউ কেউ ইংরেজি না জানার কথা বলে এড়িয়ে যান। গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁদের কাছ থেকে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি। গত ২৭ অক্টোবর বিকেলে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ভিডিও ধারণকারী এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার সময় রিতু আক্তার নামের এক বাংলাদেশি নারীর দেখা মেলে। তিনি জানান, চীনা নাগরিকদের গাইড হিসেবে কাজ করেন এবং কয়েক মাস ধরে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর মতো আরও কয়েকজন বাংলাদেশি নারীও এ কাজে সহায়তা করেন।

চীনা নাগরিকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও করে কোথায় প্রকাশ করেন, তা জানতে চাইলে রিতু আক্তার ফ্যাংইয়ো নামের এক চীনা নাগরিককে ডেকে আনেন। পরে রিতুর মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে চীনা ভাষায় কথা হয়। গুগল ট্রান্সলেটর ব্যবহার করে ফ্যাংইয়ো প্রথম আলোকে জানান, পণ্যের প্রচারণার উদ্দেশ্যে তাঁরা চীনের উইচ্যাট প্ল্যাটফর্মে এসব লাইভ ভিডিও করেন। তবে কেন উত্তরার এই এলাকাকে বেছে নেওয়া হয়েছে এবং এত দীর্ঘ সময় ধরে ভিডিও করা হয় কেন—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি আর আগ্রহ দেখাননি। একপর্যায়ে রিতুকে ধমক দিয়ে সেখান থেকে চলে যান। রিতু আক্তার জানান, চীনা নাগরিকদের গাইড হিসেবে কাজ করার বিনিময়ে তিনি প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পান। তাঁর দাবি, এসব ভিডিও চীনের উইচ্যাট, ডুয়িনসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করে আয় করেন তাঁরা। নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস রয়েছে—এমন এলাকার প্রতি চীনা নাগরিকদের আগ্রহ বেশি বলেও জানান তিনি।

ভিডিওতে কী ধরনের বক্তব্য দেওয়া হয়
ভিডিও ধারণের সময় চীনা নাগরিকদের নিজেদের ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের বক্তব্য বুঝতে পারেন না। তবে ভিডিও দেখে বোঝা যায়, তাঁরা আশপাশের পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে বর্ণনা করছেন। প্রতিবেদনে কয়েকজনের বক্তব্য গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে অনুবাদ করে চীনা ভাষা জানা চারজন বাংলাদেশির সহায়তায় যাচাই করা হয়। এতে দেখা যায়, উত্তরায় অবস্থান করে ভিডিও করলেও কোনো কোনো চীনা নাগরিক লাইভে নিজেদের ভারতের নয়াদিল্লি থেকে যুক্ত হয়েছেন বলে পরিচয় দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বাংলাদেশের মানুষের দারিদ্র্য, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও জীবনযাত্রা নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করছেন। বাংলাদেশি পুরুষদের অর্থ ব্যবহারের ধরন নিয়েও নেতিবাচক বক্তব্য দিতে শোনা গেছে। কয়েকজন নারী চীনা নাগরিককে আবার বলতে শোনা যায়, ভারতে বিয়ে হওয়ার কারণে তাঁরা সেখানে স্বামী-সংসার নিয়ে বসবাস করছেন।

গত ১ নভেম্বর উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের খালপাড়ে দাঁড়িয়ে টেকপাড়ার দৃশ্য লাইভে দেখাচ্ছিলেন মিয়ানমিয়ান নামের এক চীনা নারী। তিনি নিজেকে চীনের সিচুয়ান প্রদেশের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দেন। ভিডিওতে তিনি এলাকাটিকে নয়াদিল্লি বলে উল্লেখ করেন। সেখানকার বাড়িঘরকে অপরিচ্ছন্ন ও অনুন্নত বলে বর্ণনা করেন। টিনের ঘরে ফ্যান না থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের শৌচাগার ব্যবহারের ধরন নিয়েও মন্তব্য করেন। টেকপাড়ার একটি ছোট সেতুর দুই পাশে থাকা চায়ের দোকানেও ভিডিও ধারণ করছিলেন ওয়াং ওয়েই নামের আরেক চীনা নাগরিক। লাইভে তাঁকে চায়ের দোকানে বসে থাকা মানুষদের পানীয় নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করতে শোনা যায়। তিনি চায়ের উপাদান নিয়ে ভিত্তিহীন দাবি করেন এবং একপর্যায়ে বলেন, চা নাকি নদীর অপরিচ্ছন্ন পানি দিয়ে তৈরি। স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন নিয়েও নেতিবাচক মন্তব্য করেন তিনি।

তবে সব ভিডিওতেই বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বক্তব্য ছিল না। লি ইয়াং নামের এক চীনা নাগরিককে উত্তরার বিভিন্ন ভবনে লাগানো শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র দেখিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, এখানকার মানুষও এসি ব্যবহার করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে চীনা পণ্য তাঁদের পছন্দ। দর্শকদের কাছে এসির ব্র্যান্ড জানতে চেয়ে সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কার দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ
উত্তরার বিভিন্ন অলিগলি ও আবাসিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভিডিও ধারণের ঘটনায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, রাস্তাঘাট ও দোকানপাটের পাশাপাশি কখনো কখনো অনুমতি ছাড়াই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে ভিডিও করেন চীনা নাগরিকেরা। স্থানীয় বাসিন্দা রোজিনা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, মাঝেমধ্যে এসব ব্যক্তি ঘরের ভেতরে ঢুকে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। ঘরের পরিবেশ সব সময় ভিডিও করার উপযোগী থাকে না। এ অবস্থায় হঠাৎ কেউ প্রবেশ করে ভিডিও করলে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। আরেক বাসিন্দা পাপিয়া বেগম অভিযোগ করেন, ভিডিও করতে করতে কেউ কেউ বাথরুমেও প্রবেশ করেন। প্রতিবাদ করলে তাঁরা বিষয়টি না বুঝে হাসেন এবং দুঃখ প্রকাশ করে চলে যান। কিছুদিন পর আবার একইভাবে ফিরে আসেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে, কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।

চীনা নাগরিকদের কর্মকাণ্ডে পুলিশের নজরদারি কতটা
স্থানীয় বাসিন্দারা আপত্তি জানালেও চীনা নাগরিকদের ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম সম্পর্কে পুলিশের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই বলে জানা গেছে। থানা-পুলিশের ভাষ্য, উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের ভিডিও করতে দেখা গেলেও এসব ভিডিও কোথায় প্রকাশ করা হয় বা কেন করা হয়, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ভাষাগত জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনাগ্রহের কারণে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করাও কঠিন হচ্ছে। উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ খালিদ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, চীনা নাগরিকেরা কেন ভিডিও করেন বা সেগুলো কোথায় প্রকাশ করেন, তা তাঁর জানা নেই। তবে তাঁদের ভিডিও ধারণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং এ নিয়ে কাজ চলছে।
  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: স্টাফ রির্পোটার।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সংঘাতের উত্তাপের মাঝে সন্তানকে আগলে মায়ের ছুটে চলা, আবেগঘন ছবি ভাইরাল

সংঘাতের উত্তাপের মাঝে সন্তানকে আগলে মায়ের ছুটে চলা, আবেগঘন ছবি ভাইরাল