নির্যাতনের মাধ্যমে প্রাপ্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কোনো আইনগত মূল্য নেই বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা বা গাইডলাইনও নির্ধারণ করেছে আদালত। বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরীন আক্তারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ “ইনজামামুল ইসলাম (জিসান) বনাম রাষ্ট্র” মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত বলেন, নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি “কলুষিত প্রমাণ” এবং আইনের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ মূল্যহীন। এমন স্বীকারোক্তি কখনোই স্বেচ্ছায় দেওয়া বা সত্য হতে পারে না।
রায়ে বলা হয়, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের আগে অভিযুক্তকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে, যাতে তিনি পুলিশি প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন। পাশাপাশি জবানবন্দি গ্রহণের সময় আইনজীবীর উপস্থিতি ও পরামর্শের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় আসামি তার পছন্দের আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করতে পারবে এবং সেই সুযোগ না দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না। জবানবন্দি রেকর্ডের সময় প্রসিকিউশন ও ডিফেন্সের আইনজীবীরা চাইলে উপস্থিত থাকতে পারবেন।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) ১৬৪ ও ৩৬৪ ধারা অনুযায়ী জবানবন্দি রেকর্ড করতে হবে এবং তা অবশ্যই অডিও-ভিডিও মাধ্যমে ধারণ করতে হবে। একাধিক আসামির জবানবন্দি একসঙ্গে নেওয়া যাবে না। এছাড়া একটি মনিটরিং টিম গঠনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে, যা সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের নেতৃত্বে কাজ করবে এবং প্রতি তিন মাসে প্রধান বিচারপতির কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে। অনিয়ম পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
রায়ে বিচারপতিরা আধুনিক বিচারব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মিরান্ডা বনাম অ্যারিজোনা মামলা-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়, অভিযুক্তকে নীরব থাকার অধিকার এবং আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ দিতে হবে। মামলার প্রেক্ষাপটে বলা হয়, ২০১৪ সালের একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেওয়া জবানবন্দি নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে রিমান্ডে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগও উঠে, যা বিচার প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
হাইকোর্ট তদন্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করে এবং বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়। আদালতের মতে, ভুল তদন্ত ও অমানবিকভাবে নেওয়া স্বীকারোক্তি ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। এই রায়কে আইনি বিশেষজ্ঞরা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন