২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশ থেকে ঘোষণা করা হয় ‘এক দফা’—সরকারের পতনের দাবি। এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকারবিরোধী গণআন্দোলনের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। দিনের শুরুতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংলাপের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গণভবনের দরজা খোলা এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান চান।
তবে কয়েক ঘণ্টা পরই সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ‘এক দফা’ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সরকারের পতন এবং ফ্যাসিবাদের অবসানই আন্দোলনের একমাত্র দাবি। একই সঙ্গে আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত হত্যা, গুম ও দমন-পীড়নের বিচারও দাবি করা হয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ শহীদ মিনারে সমবেত হন। ‘দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’ এবং ‘জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’—এমন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
সমাবেশে আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এতে কর ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ থেকে বিরত থাকা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মবিরতি এবং প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স না পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়। এদিকে একই দিনে রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, মিরপুর ও সায়েন্সল্যাবসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল শহীদ মিনারে যোগ দেয়। পাশাপাশি চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, গাজীপুর, বগুড়া, সিলেট, কুষ্টিয়া, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়।
একই দিনে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, জনগণের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সেনাবাহিনী সব সময় জনগণের পাশে থাকবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেন, একটি মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও দাবি করেন, আন্দোলন আর শুধু কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। ৩ আগস্টের শহীদ মিনারের এই সমাবেশ ও ‘এক দফা’ ঘোষণা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এর মধ্য দিয়েই আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তিত হয় এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন