ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে একটি কাঠামোগত সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সম্ভাব্য এই সমঝোতা শুধু গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুনরায় সচল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, ইরান আর বেশিদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন এই জলপথ দিয়ে প্রায় দুই কোটি থেকে দুই কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পরিবহন করা হয়। বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর ইরান ওমানের সঙ্গে জলপথটির ব্যবস্থাপনায় আনুষ্ঠানিক ভূমিকা নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে শুধু দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হলেই যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত নয়।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, হরমুজে অবাধ নৌ চলাচল পুরোপুরি পুনরুদ্ধারের আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের একাধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্ত পূরণ করতে হবে। এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্যবাহী চালানের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত সেবা ফি বা যাতায়াত ফি নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। অন্যদিকে ওমান বাধ্যতামূলক টোলের পরিবর্তে স্বেচ্ছামূলক ফি ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছে।
ইরানের প্রস্তাব কার্যকর হলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব হতে পারে বিশাল। যুদ্ধপূর্ব সময়ের মতো জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে সব বাণিজ্যিক চালানের ওপর ৭ শতাংশ ফি আদায় করা সম্ভব হলে বছরে প্রায় ১৪ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত মোট রাজস্ব পাওয়ার একটি তাত্ত্বিক হিসাব করা হয়েছে। ব্যয় বাদ দেওয়ার পর সম্ভাব্য নিট আয় প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই হিসাব নিশ্চিত কোনো আয় নয়। কারণ ফি কত নির্ধারণ করা হবে, কতসংখ্যক জাহাজ তা দেবে, কোন কোন পণ্য বা জাহাজ ছাড় পাবে এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও আইনি জটিলতা কতটা প্রভাব ফেলবে—এসব বিষয়ের ওপর প্রকৃত আয় নির্ভর করবে।
বিষয়টি বোঝাতে বড় একটি তেলবাহী জাহাজের উদাহরণও সামনে এসেছে। প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী একটি বড় জাহাজে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৮০ ডলার ধরা হলে পুরো চালানের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬ কোটি ডলার। এর ওপর ৭ শতাংশ ফি আরোপ করা হলে একটি জাহাজ থেকেই প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ ডলার আদায়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে এত বড় ফি আরোপের ক্ষেত্রে বড় বাধাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে ব্যবহৃত প্রণালিতে জাহাজের চলাচলের অধিকার রয়েছে। নির্দিষ্ট সেবার বিনিময়ে যুক্তিসংগত ফি নেওয়ার সুযোগ থাকলেও জাহাজ চলাচলের অনুমতিকে শর্তসাপেক্ষ করে পণ্যের মূল্যের ওপর বাধ্যতামূলক বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করা নিয়ে আইনি প্রশ্ন রয়েছে। হরমুজ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, ইরান কি এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে? বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নিয়ন্ত্রিত ট্রানজিট ব্যবস্থা চালু হলে ভবিষ্যতে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের শর্ত নির্ধারণে ইরানের প্রভাব অনেক বেড়ে যেতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও হরমুজের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সম্ভাব্য ১৪ হাজার কোটি ডলার বার্ষিক মোট রাজস্ব ইরানের মোট অর্থনীতির একটি বড় অংশের সমান হতে পারে। এমনকি এই অর্থ আয় করতে ইরানকে অতিরিক্ত তেল উৎপাদনের প্রয়োজন হবে না; শুধু গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথ ব্যবহারের ওপর প্রভাব বিস্তার করেই বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে উচ্চহারে ফি আরোপ করা হলে উল্টো ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। জাহাজ মালিক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বিকল্প পথ বেছে নিতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, অর্থ পরিশোধের বৈধতা, বীমা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক আইনি বিরোধও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই হরমুজ প্রণালিতে ৭ শতাংশ ফি থেকে বছরে শত শত কোটি ডলার আয়ের হিসাবকে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ আয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি হরমুজের কৌশলগত গুরুত্ব এবং জলপথটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরানের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি তাত্ত্বিক চিত্র। শেষ পর্যন্ত হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ফি কাঠামো তৈরি, অর্থ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ও আইনি সমঝোতা—এই বিষয়গুলো সমাধান না হলে কাগজে-কলমের বিশাল অঙ্কের রাজস্ব বাস্তবে অর্জন করা কঠিন হবে।
সূত্র: গালফ নিউজ
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন