স্মার্টফোন, ট্যাব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শিশু-কিশোরদের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবর্তে অনেক শিশুই দিনের বড় একটি সময় কাটাচ্ছে ডিজিটাল পর্দার সামনে। ফলে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের নীরব আসক্তি, যার প্রভাব পড়ছে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা ইউনিয়নের ঘোনা গ্রামের ছয় বছরের শিশু অর্ণব অনায়াসে ইউটিউব কিডস চালাতে পারে। কিন্তু নিজের জুতার ফিতা বাঁধতে পারে না। আবার ঢাকার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া বাংলার চেয়ে হিন্দিতে বেশি সাবলীল হয়ে উঠছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ছোট ভিডিও দেখতে দেখতে।
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও দেখা যাচ্ছে একই ধরনের চিত্র। ক্লাসে শিক্ষক যখন বোর্ডে লিখে পাঠ বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তখন অনেক শিক্ষার্থীর চোখ থাকছে মুঠোফোনের পর্দায়। কেউ বার্তা দেখছে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন পরীক্ষা করছে, আবার কেউ ছোট ভিডিও দেখতে ব্যস্ত। ফলে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থেকেও অনেক শিক্ষার্থী কার্যত পাঠদানে মনোযোগ দিতে পারছে না। গবেষণার তথ্য বলছে, বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহারের প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল পর্দা ও খেলাধুলার যন্ত্রে সময় কাটাচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে এই সময় আরও বেশি, যা ঘুম, শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, এক বছরের কম বয়সি শিশুদের পর্দার সামনে সময় কাটানো উচিত নয়। এক থেকে চার বছর বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা বা তার কম পর্দা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর ১৭ বছরের কম বয়সিদের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা পর্দা ব্যবহারের সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিশুই এই সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সময় মুঠোফোন, ট্যাব, টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটারের সামনে কাটাচ্ছে। এর ফলে শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যাওয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, ঘুমের সমস্যা এবং ভাষা ও শেখার বিকাশে বিলম্বের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক দক্ষতা ও সহমর্মিতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি উদ্বেগ ও রাগের প্রবণতাও বাড়তে পারে।
অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহারের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে শিশুদের ঘুমের ওপর। রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট ভিডিও দেখা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান এখন অনেক কিশোর-কিশোরীর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি যত বাড়ে, ঘুমের মান তত খারাপ হওয়ার প্রবণতাও বাড়ে।
শুধু ঘুম নয়, শারীরিক সমস্যাও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় ভুগছে এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথাব্যথার কথা জানিয়েছে। অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের ঘাটতি, স্থূলতা, চোখের সমস্যা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জটিলতার সম্পর্কও উঠে এসেছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, লাগামহীন ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার শিশুদের বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করে দিতে পারে। অতিরিক্ত পর্দানির্ভরতায় তাদের কল্পনাশক্তি, মনোযোগ ও স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক আসক্ত শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক ধরনের কাল্পনিক জগতের মধ্যে বসবাস করতে শুরু করে। এমনকি ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়ার প্রতিও অনীহা তৈরি হতে পারে।
ডিজিটাল আসক্তির সঙ্গে কিশোর অপরাধের ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এসেছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে এক হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া অনেক কিশোরের মুঠোফোন বিশ্লেষণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। মালয়েশিয়া অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার আইন অনুমোদিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, স্পেন ও নরওয়েসহ আরও কয়েকটি দেশও শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশে শ্রেণিকক্ষে মুঠোফোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এর বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। ফলে শিশুদের পর্দা ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—তিন পক্ষেরই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিশুকে কান্না থামাতে, খাওয়াতে কিংবা ব্যস্ত রাখতে সবসময় মুঠোফোন হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে খেলাধুলা, বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা জরুরি। কারণ প্রযুক্তি শিশুদের শেখার সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার তাদের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন