ঢাকার সড়কে ট্রাফিক পুলিশ চোখে না থাকলেও এখন আর ইচ্ছেমতো ট্রাফিক আইন ভাঙার সুযোগ থাকছে না। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ক্যামেরার মাধ্যমে চলছে নীরব নজরদারি। সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, লেন ব্যবহারে অনিয়ম কিংবা হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানোর মতো অপরাধ ক্যামেরায় ধরা পড়লেই গুনতে হতে পারে জরিমানা।
ইতোমধ্যে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে শনাক্ত করা অপরাধের মামলায় ২৯ লাখ টাকার বেশি জরিমানা আদায় হয়েছে বলে জানা গেছে। নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার সঙ্গে চালকদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে শুরুতে কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ। তবে একই অপরাধ বারবার করলে জরিমানার পরিমাণ প্রথমবারের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে। ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার আইন অমান্য করলে প্রচলিত আইনে কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
এআই ক্যামেরায় শনাক্ত বিভিন্ন অপরাধের মধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা বা মেয়াদোত্তীর্ণ হলে বড় যানবাহনের জন্য ৫ হাজার এবং ছোট যানবাহনের জন্য ৪ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। ফিটনেস না থাকা বা মেয়াদোত্তীর্ণ হলে বড় যানবাহনে ১০ হাজার এবং ছোট যানবাহনে ৩ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারিত রয়েছে। রেজিস্ট্রেশন বা নম্বর প্লেট না থাকলে জরিমানা ১০ হাজার টাকা। অনুমতি ছাড়া গাড়ির রং পরিবর্তন করলে বড় যানবাহনে ১০ হাজার এবং ছোট যানবাহনে ৩ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।
বেপরোয়া গাড়ি চালানো, লেন বন্ধ করে গাড়ি চালানো বা দাঁড় করানো, ভাঙা কাচ ব্যবহার কিংবা ইন্ডিকেটর লাইট না থাকা এবং চলাচলের অনুপযোগী যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে ২ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা হতে পারে। উল্টো পথে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, সিটবেল্ট না বাঁধা এবং গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে বড় যানবাহনে ৩ হাজার এবং ছোট যানবাহনে ১ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।
এ ছাড়া মোটরসাইকেলে দুজনের বেশি যাত্রী বহন এবং হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এআই ক্যামেরার কার্যক্রমও বেশ স্বয়ংক্রিয়। কোনো যানবাহন ট্রাফিক আইন ভাঙলে ক্যামেরা সেই ঘটনার ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য ধারণ করবে। এরপর তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় পাঠানো হবে। গাড়ির নিবন্ধিত মালিকের মোবাইল নম্বরে অপরাধ ও জরিমানার তথ্য জানিয়ে বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
নির্ধারিত মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই জরিমানা পরিশোধ করা যাবে। ফলে সড়কে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ চোখে না পড়লেও ক্যামেরার নজর এড়িয়ে আইন ভাঙার সুযোগ কমে আসছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি অপরাধের দিকে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, লেন ব্যবহারে অনিয়ম এবং যত্রতত্র গাড়ি থামানো বা পার্ক করা। পর্যায়ক্রমে আরও বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকে এআই ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে নম্বর প্লেট নিয়েও বাড়তি নজরদারি করা হচ্ছে। অস্পষ্ট বা পাঠযোগ্য নয় এমন নম্বর প্লেট শনাক্তকরণে সমস্যা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে নিবন্ধনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশার বিষয়টিও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি করছে। এসব সমস্যা সমাধানে স্পষ্ট ও পাঠযোগ্য নম্বর প্লেট নিশ্চিত করতে বিশেষ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি ২০ থেকে ২৫ বছর পুরোনো বাস ও ট্রাক পর্যায়ক্রমে সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে বলেও জানা গেছে।
ট্রাফিক বিভাগ চালকদেরও সতর্কভাবে আইন মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে। নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, সিগন্যাল অমান্য না করা, উল্টো পথে না যাওয়া, ঝুঁকিপূর্ণভাবে লেন পরিবর্তন না করা এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ওভারটেক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার না করা, মোটরসাইকেলে হেলমেট পরা, গাড়িতে সিটবেল্ট ব্যবহার করা এবং অবৈধ স্থানে গাড়ি পার্ক না করার পাশাপাশি ড্রাইভিং লাইসেন্স, নিবন্ধন ও ফিটনেস হালনাগাদ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে জরিমানা কার্যক্রম চালু হওয়ায় প্রতারণার আশঙ্কাও রয়েছে। ভুয়া জরিমানার বার্তা পাঠিয়ে প্রতারকরা মানুষকে ফাঁদে ফেলতে পারে। তাই অপরিচিত কোনো লিংকে প্রবেশ করে ব্যাংক হিসাবের তথ্য, মোবাইল আর্থিক সেবার গোপন নম্বর কিংবা এককালীন গোপন সংকেত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কোনো জরিমানার বার্তা পাওয়া গেলে তা নির্ভরযোগ্য সরকারি মাধ্যমে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এআই ক্যামেরার মূল উদ্দেশ্য শুধু জরিমানা আদায় নয়। বরং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, চালকদের ট্রাফিক আইন মানতে উৎসাহিত করা এবং দুর্ঘটনা কমানোই এই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন