ঢাকা | |

জ্বালানির বহুমুখী সংকটে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নাজুক

গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের একযোগে সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর সঙ্গে যোগ
  • আপলোড সময় : ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৫৬ সময়
  • আপডেট সময় : ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৫৬ সময়
জ্বালানির বহুমুখী সংকটে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নাজুক

গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের একযোগে সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ থাকা। ফলে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা বিদ্যুৎ সংকট আগস্টের শেষ দিনেও কাটেনি। বরং রবিবার রাতে লোডশেডিং সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। সোমবার দুপুরেও দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৮ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এতে রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে মানুষকে। তীব্র গরমের মধ্যে ফ্যান, পানির পাম্প ও বৈদ্যুতিক চুলা চালাতে না পারায় জনজীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে। পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কৃষিতে সেচ কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামারগুলোও ক্ষতির মুখে পড়েছে।


পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের ঘণ্টাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুর ১টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৪২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৯০৪ মেগাওয়াট, অর্থাৎ চাহিদার ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়নি। এর আগে রাত ২টায় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৮০৯ মেগাওয়াট। তখন সরবরাহ নেমে আসে ১৩ হাজার ২১৪ মেগাওয়াটে। ফলে লোডশেডিং দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াটে, যা ওই সময়ের সর্বোচ্চ ঘাটতি।


সোমবার রাত ১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টার হিসাবে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৫০৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। সকাল ১১টায় ঘাটতি ১ হাজার ৪৪৫ মেগাওয়াটে নেমে এলেও মাত্র এক ঘণ্টা পর দুপুর ১২টায় তা বেড়ে ৩ হাজার ১০১ মেগাওয়াটে পৌঁছে যায়। বিদ্যুৎ সরবরাহের এমন ওঠানামার কারণে বিতরণ কোম্পানিগুলোও নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী লোডশেডিং পরিচালনা করতে পারছে না।


এর আগের দিন রবিবারও পরিস্থিতি ছিল নাজুক। ওই দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৬৯২ মেগাওয়াট। সারাদিনে প্রায় ৩৪ কোটি ৪৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও চাহিদা ছিল প্রায় ৪১ কোটি ৬০ লাখ ইউনিট। ফলে ৭ কোটি ১৫ লাখ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ এক দিনে মোট চাহিদার প্রায় ১৭ দশমিক ২ শতাংশ বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল।


গ্যাস সংকটেই বড় ধাক্কা,

বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি গ্যাসের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে রবিবার সন্ধ্যায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে ২৩২ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। ফলে ঘাটতি ছিল প্রায় ১৪৮ কোটি ঘনফুট বা ৩৯ শতাংশ।


গ্যাসের অভাবে ঘোড়াশাল, সিদ্ধিরগঞ্জ, মেঘনাঘাট ও আশুগঞ্জের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি অথবা আংশিক বন্ধ রয়েছে। কিছু কেন্দ্র আবার গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে সক্ষমতার সামান্য অংশ ব্যবহার করতে পারছে। মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন এলএনজি কার্গো এলে সেপ্টেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে একটি কার্গো দিয়ে এত বড় ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়।


অর্ধেক সক্ষমতায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র,

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে।


পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ থাকায় অন্তত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া রামপাল ও পটুয়াখালীর আরএনপিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার মজুত কম থাকায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বড়পুকুরিয়ার একটি ইউনিটও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে। ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও পুরো সক্ষমতা পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি আকস্মিক বন্যার কারণে নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিও বন্ধ রয়েছে।


তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালিয়েও মিলছে না স্বস্তি,

গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি সামাল দিতে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার। গত এক সপ্তাহে এসব কেন্দ্রের জন্য অন্তত ২০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল সরবরাহ করা হয়েছে, যা নির্ধারিত সরবরাহের প্রায় দ্বিগুণ।


তবে তেল সংকটের কারণে দেশের ২৮টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি অথবা আংশিক বন্ধ রয়েছে। দিনের বেশির ভাগ সময় এসব কেন্দ্র থেকে দেড় হাজার থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে এ পদ্ধতিতে সংকট মোকাবিলা করাও কঠিন। রবিবার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল ৭ টাকা ৭৪ পয়সা। তেলভিত্তিক উৎপাদন বাড়লে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।


রাজধানীতেও দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ যাচ্ছে,

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব এখন রাজধানীর তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও পড়েছে। গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা, ধানমন্ডি, বেইলি রোড ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মগবাজার, বাড্ডা, রামপুরা, পুরান ঢাকা, শ্যামলী ও যাত্রাবাড়ীর অনেক এলাকায় দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। একেকবার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প, ফ্রিজ, ফ্যান ও বৈদ্যুতিক চুলা চালানো যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং ঘরে বসে অনলাইনভিত্তিক কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।


শিল্পকারখানায় বাড়ছে ক্ষোভ

গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জ্বালানিনির্ভর শিল্প। বস্ত্র, ডায়িং, সিরামিক ও ইস্পাত কারখানার অনেকগুলোতে উৎপাদন কমেছে বা বন্ধ রয়েছে। নরসিংদীর মাধবদীতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিভিন্ন কারখানার প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবিতে বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও এবং মহাসড়ক অবরোধ করেন। শ্রমিকদের আশঙ্কা, উৎপাদন স্বাভাবিক না হলে বেতন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি চাকরিও হারাতে পারেন তারা।


সব মিলিয়ে এলএনজি সরবরাহে বাধা, দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি, কয়লার স্বল্পতা, তেল সরবরাহের সংকট এবং বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের একাধিক ইউনিট বন্ধ থাকায় দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চরম চাপে রয়েছে। নতুন এলএনজি কার্গো এলে সেপ্টেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। তবে পায়রা ও মাতারবাড়ীর বন্ধ ইউনিট চালু করা, কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গ্যাসের ঘাটতি কমানো না গেলে দ্রুত লোডশেডিং পরিস্থিতির বড় উন্নতির সম্ভাবনা কম। আর গরম অব্যাহত থাকলে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
পশ্চিমবঙ্গে শিগগিরই পুনরায় ক্ষমতায় ফিরবে তৃণমূল: মমতা

পশ্চিমবঙ্গে শিগগিরই পুনরায় ক্ষমতায় ফিরবে তৃণমূল: মমতা