ঢাকা | |
সংবাদ শিরোনাম :

তিন ট্রাকভর্তি ৪ লাখ পাঠ্যবই জব্দ নিয়ে তুলকালাম!

মাধ্যমিকের ৪ লাখ ৩০ হাজার ৪০১ কপি পাঠ্যবই নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক। নিম্নমানের অভিযোগে তিন ট্রাকভর্তি
  • আপলোড সময় : ৩ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১১:৩৫ সময়
  • আপডেট সময় : ৩ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১১:৩৫ সময়
তিন ট্রাকভর্তি ৪ লাখ পাঠ্যবই জব্দ নিয়ে তুলকালাম!

মাধ্যমিকের ৪ লাখ ৩০ হাজার ৪০১ কপি পাঠ্যবই নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক। নিম্নমানের অভিযোগে তিন ট্রাকভর্তি বই আটকে দেওয়ার পর পুনরায় পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়েছে মাত্র ১৪৬ কপি বই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, শুরুতে নিম্নমানের যে অভিযোগে এত বিপুলসংখ্যক বই আটকে দেওয়া হয়েছিল, পরীক্ষার পর তার সঙ্গে চূড়ান্ত ফলাফলের এত বড় পার্থক্য হলো কীভাবে? গত ২৭ সেপ্টেম্বর মাতুয়াইলে একটি ছাপাখানার সামনে থেকে তিনটি ট্রাকে এসব বই তোলা হয়। এরই মধ্যে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কাছে খবর আসে, বইগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ নিম্নমানের। বিষয়টি দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।


এরপর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের মনিটরিং টিম এবং দুটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তিন ট্রাক বই জব্দ করেন। প্রায় তিন দিন বইগুলো আটকে রেখে পুনরায় মান যাচাই করা হয়। কিন্তু পুনরায় পরীক্ষা শেষে দেখা যায়, ৪ লাখ ৩০ হাজার ৪০১ কপির মধ্যে মাত্র ১৪৬টি বইয়ের প্রচ্ছদে দাগ রয়েছে। এসব বই বাতিল করা হয়। বাকি ৪ লাখ ৩০ হাজার ২৫৫ কপি বই গত ৩০ সেপ্টেম্বর মাঠ পর্যায়ে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।


এই ঘটনাকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, শুরুতে ৬০ শতাংশ বই নিম্নমানের বলে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, তা কতটা সঠিক ছিল? নাকি বই পরিদর্শনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক প্রতিবেদনই সঠিক ছিল? ছাপাখানাটির স্বত্বাধিকারী মিন্টু মোল্লা জানিয়েছেন, বইগুলো মাঠ পর্যায়ে পাঠানোর আগে পরিদর্শনকারী প্রতিষ্ঠান যাচাই করেছিল। পরে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের মনিটরিং টিমও পরীক্ষা করে সামান্য কিছু বইয়ে ত্রুটি পেয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ বইগুলো পুনরায় ছাপিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।


এদিকে পাঠ্যবই সরবরাহে বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আগামী নভেম্বরের মধ্যে সব মাধ্যমিকের পাঠ্যবই মাঠ পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা থাকলেও গতকাল পর্যন্ত মাত্র ৫ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। এই ধীরগতি অব্যাহত থাকলে সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে আগামী মার্চ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। বই পরিদর্শনের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী শেখ বেলাল হোসাইন দাবি করেছেন, আইন অনুযায়ী প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশনের দায়িত্ব তাদের। কিন্তু জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের মনিটরিং টিম ছাড়া তারা অনেক ক্ষেত্রে এই কাজ করতে পারছেন না। তার মতে, এ কারণে বিভিন্ন ছাপাখানায় বই পরিদর্শন বিলম্বিত হচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে সরবরাহের ওপর।


তিনি উদাহরণ দিয়ে জানান, গত ২৪ সেপ্টেম্বর একটি ছাপাখানায় প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশনের কথা থাকলেও মনিটরিং টিম যেতে না পারায় সেটি তিন দিন পিছিয়ে যায়। তার দাবি, অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের বই নিয়েও একই ধরনের বিলম্ব হয়েছে। ৬০ শতাংশ নিম্নমানের বই থাকার অভিযোগে তিন ট্রাক বই আটকে রাখা হলেও পরে মাত্র ১৪৬ কপিতে ত্রুটি পাওয়া যায়। এতে তার প্রাথমিক পরিদর্শন প্রতিবেদন সঠিক ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। এদিকে আরও দুটি ছাপাখানা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ভাইভাই ও বর্ণশোভা নামের দুটি ছাপাখানার বিপুল পরিমাণ কাজ কেটে দেওয়া হয়েছিল কাগজের মান নিয়ে আপত্তির কারণে। পরে পরিদর্শনকারী প্রতিষ্ঠান জানায়, ওই ধরনের কাগজ মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য। ফলে মনিটরিং টিমের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।


তবে পাঠ্যবইয়ের সামগ্রিক মান নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দরপত্রের শর্তের তুলনায় কম মানের কাগজ ও নিম্নমানের কালি ব্যবহারের ঘটনা রয়েছে। কোথাও কোথাও বাঁধাইয়েও ত্রুটি পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত যেসব নিম্নমানের বই বা ফর্মা বাতিল করা হয়েছে, তার বড় অংশ ছোট ছাপাখানার বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও শেষ সময়ে তদারকি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।


বইয়ের মান ও ছাপার অগ্রগতি দেখতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন রাজধানীর ছয়টি ছাপাখানা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি বইয়ের গুণমান ও ছাপার কাজের অগ্রগতি যাচাই করেন। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানিয়েছেন, রোডম্যাপ অনুযায়ী বই ছাপার কাজ এগিয়ে চলছে। অনিয়ম পাওয়া গেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং মান খারাপ হলে ফর্মা বাতিল করা হচ্ছে।


অন্যদিকে, কয়েকটি ছাপাখানার মালিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে বাড়তি খরচ হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের জানিয়েছেন, পাঠ্যবইয়ের মানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বই ছাপার কাজ এগিয়ে চলছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার আশা করা হচ্ছে।


সব মিলিয়ে তিন ট্রাকভর্তি ৪ লাখ ৩০ হাজারের বেশি বই আটকে দেওয়ার পর মাত্র ১৪৬ কপি বাতিল হওয়ার ঘটনায় বই পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—মান ঠিক রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশের সব শিক্ষার্থীর হাতে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া।

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০ পদে চাকরি, আবেদন ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০ পদে চাকরি, আবেদন ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত